ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভেতর দিয়ে মেট্রোরেলের রুট নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়েছে। রুট পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একমত পোষণ করে মাঠে নেমেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। অন্যদিকে ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেলের পক্ষে শিক্ষার্থীদের আরেক পক্ষের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে ছাত্রলীগ। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যাম্পাসে আসেন এমন ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই ছাত্রলীগের এই ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ছাত্র সংগঠনগুলোর এ পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে ক্যাম্পাসে চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সংক্রান্ত অধিকাংশ কমিটিই মেট্রোরেলের রুটের পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। যাতায়াতের ভোগান্তি নিরসনের জন্য ঢাবি ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে মেট্রোরেলের রুট যাওয়ার পরিকল্পনা সঙ্গত বলেই মনে করেন তারা।
জানা যায়, ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় এমআরটি-৬ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত (২০.১ কিলোমিটার) নির্মিত হবে মেট্রোরেল। যার একটি অংশ শাহবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর দিয়ে বের হয়ে যাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হওয়ার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আন্দোলনে সমর্থন জানান।
গত ৭ জানুয়ারি ‘মেট্রোরেলের রুট বদলাও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাও’ শীর্ষক ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। ওই সময় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন থেকে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়।
এরপর ১৪ জানুয়ারি মেট্রোরেলের রুট বদলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লেখেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। চিঠিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাষ্ট্রের উন্নয়নের বিপক্ষে নয় জানিয়ে বলা হয়, রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যানজট নিরসনে মেট্রোরেল স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপটি বাস্তবায়িত হলে রাজু ভাস্কর্যসহ ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারকচিহ্নগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এর একদিন পর ১৬ জানুয়ারি মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। পাশাপাশি ১৮ জানুয়ারি বিক্ষোভ সমাবেশ ও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি পেশ করার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
এদিকে মেট্রোরেলবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের একাত্মতা ঘোষণার পর ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মসূচির দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মেট্রোরেল চাই-এই দাবিতে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীদের অপর একটি অংশ। এতে অংশ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চৈতালি, বৈশাখী ও ক্ষণিকা বাসের প্রায় শতাধিক অনাবাসিক শিক্ষার্থী। এই মানববন্ধনে ঢাবি ছাত্রলীগের সমর্থন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
১৮ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, টিএসসির সামনে রাজু ভাস্কর্যের নিচে ‘মেট্রোরেল চাই’ শীর্ষক ব্যানারে মানববন্ধন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী। ওই সময় টিএসসির সড়ক দ্বীপে ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি আদিত্য নন্দী, উপ-ছাত্রবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক মাসুমুল আলম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন ছিলেন সেখানে। বেলা ১২টার দিকে আদিত্য নন্দী ওই কর্মসূচির আহ্বায়ক মুশফিকুল হাসানকে ডেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার নির্দেশ দেন।
এ দিকে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোর জড়িয়ে যাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রলীগ মেট্রোরেলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর বাম সংগঠনগুলো রুট পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের কথা বলছে। এতে করে শুধু আন্দোলনের পক্ষ-বিপক্ষই তৈরি হচ্ছে। এখন পাল্টাপাল্টি আন্দোলন হচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের পক্ষে-বিপক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করেছে। এতে ছাত্রলীগের কোনও সম্পৃক্ততা নেই। তবে ঢাবি ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসের ওপর দিয়ে যাওয়া মেট্রোরেলের পক্ষে।’
আর মেট্রোরেলের বিপক্ষে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়ন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক তুহিন কান্তি দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একথা সত্য যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে পক্ষ-বিপক্ষের সৃষ্টি হয়েছে তা একটু হতাশার। তবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে গতকাল মেট্রোরেল চাই দাবি নিয়ে বিভিন্ন বাসের যেসব শিক্ষার্থী মানববন্ধন করেছে তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে চায় মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তন হোক। মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়ন সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষেই থাকবে।’
যোগাযোগ করা হলে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তন আন্দোলনের অন্যতম আহ্বায়ক ও ঢাবি শিক্ষার্থী অনুপম দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেট্রোরেলের পক্ষে এবং বিপক্ষেও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। এটা মূলত হচ্ছে আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোর জড়িয়ে যাওয়ার ফলে।'
সাধারণ শিক্ষার্থীদের রুট পরিবর্তনের আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনগুলোর জড়িয়ে যাওয়া আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে অনুপম বলেন, ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব আদর্শ থেকে আমাদের সঙ্গে সহমত জানাতেই পারে। তবে আমরা কারও সঙ্গে একত্রিত হয়ে আন্দোলন করতে চাই না। আন্দোলন হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে।
/এসআর/এনএস/এমএসএম/এফএস/








