আহরণ নিষিদ্ধ, তবুও বাজার ভরা জাটকা

শফিকুল ইসলাম
০৬ মার্চ ২০২২, ০৮:০০আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ১৬:৫৪

আজকের জাটকা আগামীদিনের ইলিশ- যা দেশের সম্পদ। দেশের ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে বছরের যে কোনও সময়েই জাটকা (২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চি সাইজের ইলিশ) ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। বিশেষ করে গত ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস ৬ জেলার ৫টি অভয়াশ্রমে জাটকা ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এর আওতায় রয়েছে বরিশাল, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, শরীয়তপুর ও পটুয়াখালী জেলার ইলিশ অভয়াশ্রম সংশ্লিষ্ট নদ-নদী। তারপরও প্রকাশ্যে রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র অবাধে চলছে জাটকা বিক্রি। রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এ তথ্য জানা গেছে। 

জানা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, সংশ্লিষ্ট জেলা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দফতর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক জেলে সরকারের নির্দেশ অমান্য করে নদীতে নামছে মাছ ধরতে। এ সমস্ত জেলের জালেই ধরা পড়ে শত শত টন জাটকা। যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে এবং বিক্রিও হচ্ছে। এসব জেলেরা রাতের সময়টি বেছে নেয় বলে জানা গেছে। কেননা, প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে রাতে নদীতে অভিযান পরিচালনা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

এদিকে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ এর ধারা ৩ এর উপধারা ৫ এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ঘোষিত ৫টি অভয়াশ্রমে প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ইলিশ, জাটকাসহ (২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চি সাইজের ইলিশ) সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যা ১ মার্চ থেকে কার্যকর করাও হয়েছে। এই সময় অভয়াশ্রমে মাছ আহরণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অমান্যকারীদের কমপক্ষে ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করারও বিধান রয়েছে আইনে।

মৎস্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইলিশের জন্য দেশের ৫টি অভয়াশ্রম হচ্ছে চাঁদপুর জেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার এলাকা। ভোলা জেলার মদনপুর বা চর ইলিশা হতে চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনা নদীর শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার এলাকা।  ভোলা জেলার ভেদুরিয়া হতে পটুয়াখালী জেলার চর রুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা এবং চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার মধ্যে অবস্থিত পদ্মা নদীর ২০ কিলোমিটার এলাকা এবং বরিশাল জেলার হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর, গজারিয়া ও মেঘনা নদীর প্রায় ৮২ কিলোমিটার এলাকা।

এসব অভয়াশ্রম সংশ্লিষ্ট জেলায় এ সময় মৎস্য আহরণে বিরত থাকা নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ৮০ কেজি হারে ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। নদীতে নামতে না পারার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা খাদ্য সহায়তা বাবদ এই সহায়তা পেয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, জেলেরা সরকারের কাছ থেকে সহায়তা নিয়েও নদীতে জাল ফেলা থেকে বিরত হন না। জেলেদের জালে জাটকা ধরা পড়ে এবং তা বাজারে আসে, যা খুবই স্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন রাজধানীর কোনাপাড়া বাজারের মাছ ব্যবসায়ী কালু মিয়া।   

তিনি জানিয়েছেন, নদী থেকে জাটকা যদি ওপরে আসে, তাহলে বাজারে আসতে সমস্যা কোথায়? নদী থেকে সেসব জাটকা রাজধানীর পাইকারি বাজার পর্যন্ত আসে বলেই তো আমরা খুচরা ব্যবসায়ীরা তা কিনে এনে পাড়া মহল্লায় বিক্রি করি। তিনি জানান, জাটকা বাজারে না এলে তো আমাদের পক্ষে নদী থেকে জাটকা ধরে এনে মহল্লায় বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই জাটকা বিক্রি বন্ধ করতে হলে নদী থেকে জাটকা ধরা পুরোপুরি ঠেকাতে হবে। তবেই জাটকা সংরক্ষণ হবে। নতুবা নয়।

রাজধানীর কাওরানবাজারের মাছ ব্যবসায়ী সোহরাব হোসেন জানিয়েছেন, জাটকা মাছগুলো বাজারে না এলে আমরা কিনতাম না। নদীতে ধরা বন্ধ করতে পারলে বাজারে জাটকা বিক্রি এমনিতেই বন্ধ হবে। নদীতে জাটকা ধরা বন্ধ করতে না পারলে বাজারে হামলা দিয়ে ইলিশ রক্ষা করা যাবে না।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বাজারগুলো এখনও জাটকা ইলিশে সয়লাব। বাজারের মাছ বিক্রেতারা শত শত কেজি জাটকা ইলিশ হাঁকডাক দিয়েই বিক্রি করছেন। অথচ গত ১ মার্চ মঙ্গলবার থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দু মাসের জন্য দেশের ৫টি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া সারাবছরই জাটকা আহরণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা তো রয়েছেই।

জানতে চাইলে মাতুয়াইলের মুসলিম নগর বাসিন্দা এম এ মান্নান জানিয়েছেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বাজারে বিপুল পরিমাণের জাটকা কোথা থেকে কিভাবে আসে? জাটকা বিক্রেতারা যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা না পড়েন সেজন্য ক্রেতাদের কাছে এগুলোকে জাটকা হিসেবে স্বীকার করছেন না। তারা এগুলো ‘সামুদ্রিক চাপিলা’ বলেও বিক্রি করেন বলে জানা গেছে। বাজারে প্রতিকেজি জাটকা বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিনশ থেকে চারশ টাকা দরে। প্রতিকেজিতে ৮ থেকে ১০ টি জাটকা উঠছে।

গত সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় বরিশাল, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, শরীয়তপুর ও পটুয়াখালী জেলার ইলিশ অভয়াশ্রম সংশ্লিষ্ট নদনদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এ সময় ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোতে ইলিশসহ সকল প্রকার মাছ ধরা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই নিষেধাজ্ঞা যিনি অমান্য করবেন তিনি কমপক্ষে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন অভয়াশ্রমগুলো এলাকার নদনদীতে জাটকা আহরণে বিরত থাকা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৮ জেলের জন্য মাসে ৪০ কেজি করে দুই মাসে ৮০ কেজি হারে মোট ১৯ হাজার ৫০২ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল ইতোমধ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় সরকার নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে, এটি তারই অংশ। আশা করছি এ বছরও দেশে পাঁচ লাখ টনেরও বেশি ইলিশ উৎপাদন হবে।

/এমআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
পুলিশ হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর পর ডিবির ওসি প্রত্যাহার
পুলিশ হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর পর ডিবির ওসি প্রত্যাহার
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্টের বৈঠকে কী আলোচনা হলো
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্টের বৈঠকে কী আলোচনা হলো
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের গণছাঁটাই
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের গণছাঁটাই
বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দিয়েছেন ফিফা সভাপতি: ফিলিপ লাম 
বিশ্বকাপকে বিক্রি করে দিয়েছেন ফিফা সভাপতি: ফিলিপ লাম 
সর্বাধিক পঠিত
শাহজালালের মাজারের অর্ধেক টাকা কোথায় যায়, ইঙ্গিত মিললো চিঠিতে
শাহজালালের মাজারের অর্ধেক টাকা কোথায় যায়, ইঙ্গিত মিললো চিঠিতে
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত 
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত 
আলজেরিয়ার জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, নকআউটে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কারা?
আলজেরিয়ার জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, নকআউটে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ কারা?
খুচরার পর এবার পাইকারি বিদ্যুতের দামও কমানোর উদ্যোগ
খুচরার পর এবার পাইকারি বিদ্যুতের দামও কমানোর উদ্যোগ
‘ভাই নয়’, ‘মহোদয়’ বলতে হবে, সাংবাদিককে সিভিল সার্জন
‘ভাই নয়’, ‘মহোদয়’ বলতে হবে, সাংবাদিককে সিভিল সার্জন