আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ে। মূল্যহ্রাসের ফলে জ্বালানি তেলনির্ভর দেশগুলোয় কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের ওভার টাইম বাতিল হয়ে গেছে। এ কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো টাকার পরিমাণও কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে কয়েক লাখ প্রবাসী শ্রমিকের পরিবারে। বিশেষ করে প্রবাসী সন্তানের আয়ের ওপর যে সব পরিবার নির্ভরশীল, সেই সব পরিবারে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের দিপু দীর্ঘদিন ধরে কুয়েতে শ্রমিকের কাজ করেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে তিনি বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় লাখ টাকার অর্থ বাংলাদেশে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই মূলত তার সংসার চলত। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্য অব্যাহতভাবে কমার কারণে এক বছর ধরে সেই দেশে আর তিনি ওভারটাইম পাচ্ছেন না। এর ফলে আগে তিনি বাড়িতে যে টাকা পাঠাতে পারতেন, এখন তার অর্ধেক পাঠাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে দিপুর পরিবার।
এ প্রসঙ্গে দিপুর মা আকলিমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দিপু আগে দেড় লাখ টাকা করে মাসে পাঠাত। এখন ১ লাখ টাকাও পাঠাতে পারে না। অথচ সংসারে খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। তিনি বলেন, ছেলে (দিপু) আগে ওভারটাইম কাজ করে প্রায় মাসে ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় করত। এখন আর ওভারটাইম করতে পারে না।
শুধু দিপুর পরিবার নয়, তার মতো আরও কয়েক লাখ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের আরও কয়েজন প্রবাসী শ্রমিকের আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারাও দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন।
প্রবাসীদের আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। মঙ্গলবার তৈরি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরের জানুয়ারি মাসের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সবচেয়ে কম রেমিটেন্স এসেছে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। এই জানুয়ারিতে প্রবাসীরা রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ১১৫ কোটি ১৯ লাখ ডলার। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তারা পাঠিয়েছিলেন ১২৪ কোটি ৩২ লাখ ডলার। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা বাংলাদেশে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ১২৬ কোটি ৬ লাখ ডলার। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তারা রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন ১৩২ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে প্রবাসী আয়ে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তিনি মনে করেন, আগামী মাসগুলোয়ও রেমিটেন্স কমার প্রবণতা থাকবে। আর প্রবাসী আয় কমার প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে রেমিটেন্সের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোয় আয় কমে যাচ্ছে। আর কোনও দেশের আয় কমে গেলে, সেখানকার শ্রমিকদেরও আয় কমে যায়। কারণ তাদের সেখানে বাড়তি আয় বা ওভার টাইম কাজ করার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এতে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতাও থমকে যায়। যার ফলে সেখান থেকে দেশে রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণও কমে যায়। এই গবেষকের আশঙ্কা, আগামী মাসগুলোয়ও রেমিটেন্স প্রবাহ কমতে থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত কয়েক মাস ধরেই রেমিটেন্স প্রবাহ কমছে। ২০১৪ সালে রেমিট্যান্স প্রবাহে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৮ শতাংশে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের তুলনায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে প্রায় ১৬ কোটি ডলারের সম পরিমাণ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টার প্রেস নেটওয়ার্কের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য কমে যাওয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা সমস্যার কারণে প্রবাসীদের আয়ও কমে গেছে। গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেল নির্ভরদেশগুলোয় আয় কমে গেছে। ওইসব দেশের শ্রমিকরা বাড়তি আয় করতে পারছেন না। ফলে বিভিন্ন দেশে জীবনযাপন ব্যয় বেড়ে গেছে। এসব কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের শ্রমিকদেরও টাকা পাঠানোর পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি সিনিয়র গবেষক আনোয়ারুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের একটা বড় অংশ রয়েছে জ্বালানি তেল নির্ভর দেশগুলোয়। এই দেশগুলোয় শ্রমিকরা নির্ধারিত কাজের পাশাপাশি ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজ করতেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক বিশেষ করে জ্বালানি তেল নির্ভর দেশগুলোয় কিছু দিন যাবত আয় কমে গেছে। যার ফলে ওই সব দেশে অবস্থানকারী শ্রমিকদেরও আয় কমেছে। যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক রেমিটেন্স প্রবাহের ওপর।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। তাদের সিংহভাগই শ্রমিক, যারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে আছেন এক লাখের কিছু বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে কুয়েতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১১০ কোটি ডলার দেশে পাঠালেও ২০১৫ সালে পাঠিয়েছেন ১০৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার। জ্বালানি তেলের মূল্যের অব্যাহত দরপতনের প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রুনাই, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, লিবিয়া, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাসীরা ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে রেমিটেন্স কম পাঠিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২০১৪ সালে রেমিটেন্স এসেছিল ২৭৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭৬ কোটি ১৫ লাখ ডলারে। ২০১৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীরা ৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার বাংলাদেশে পাঠালেও ২০১৫ সালে পাঠিয়েছেন ৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার দেশে পাঠালেও ২০১৫ সালে পাঠিয়েছেন ৮৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এদিকে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী-আয় কমেছে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রমিকরা আগে যে বেতন পেতেন এখন তার চেয়ে কম পাচ্ছেন। এর ফলে প্রবাসীরা তাদের আয়ের টাকাও কম পাঠাচ্ছেন।
/এমএনএইচ/আপ-এনএস/








