X
বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২
২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

জামিনে বেরিয়ে আসা জঙ্গিদের কতটা নজরদারি হয়?

নুরুজ্জামান লাবু
০১ জুলাই ২০২২, ০০:০৫আপডেট : ০১ জুলাই ২০২২, ১৫:৫৮

বাংলাদেশে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ও আল নুসরা ফ্রন্টের হয়ে সদস্য সংগ্রহের কাজ করছিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে কমলাপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তিন বছরের মাথায় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় কারাগার থেকে সে জামিনে বের হয়ে আসে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায় ভারতে। সেখান থেকেই সে বাংলাদেশ-ভারতে জঙ্গিদের সংগঠিত করছিল। কিন্তু ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতারের পর সামিউনের জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় তোলপাড় শুরু হয়।

শুধু সামিউন নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ অনেক নেতা ও সাধারণ সদস্য অনেকেই জামিন নিয়ে ফের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জামিনে বের হয়ে আসা জঙ্গিদের কতটা নজরদারি করা হয়? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ পর্যায়ের জঙ্গিরা জামিনে বের হলে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বা পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যদের জানিয়ে থাকে। এরপর জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যের ওপর নজরদারি করা হয়। তবে সব জঙ্গির ক্ষেত্রে এটি করা হয় না। সাধারণত শীর্ষ জঙ্গিদের ক্ষেত্রে নজরদারি করা হয়।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট-সিটিটিসির প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা জামিনে বের হয়ে আসা শীর্ষ জঙ্গিদের নজরদারি করি। তারা কেউ পুনরায় জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে কিনা, তা নজরদারি করা হয়। এছাড়া তারা জামিনে বের হয়ে এসে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে বা কোথায় যাতায়াত করছে, তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।’

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, জঙ্গিবাদের ঘটনায় সাধারণত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। সারা দেশে এ পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রায় ২১০০ মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৫ শতাধিক। এসব আসামি তথা জঙ্গি সদস্যদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি জঙ্গি জামিনে রয়েছে। পলাতক রয়েছে তিন শতাধিক জঙ্গি।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০১৮ সালে চালু হওয়ার পর থেকে তারা জঙ্গিদের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরির চেষ্টা করছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তারা জঙ্গিবাদ তথা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা পেয়েছেন ২ হাজার ১০০টি। এসব মামলায় ৯ হাজার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ৫৫০ জন জঙ্গি জামিন পেয়েছে।

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের ওই কর্মকর্তা আরও  জানান, তারা নিয়মিত জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের মনিটরিং করেন। তবে জনবল স্বল্পতার কারণে কার্যকরীভাবে মনিটর করা যাচ্ছে না। তারা জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রতি মাসে অন্তত দুই বার মোবাইলের মাধ্যমে সরাসরি জঙ্গি সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, অথবা তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এছাড়া তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গেও যোগাযোগ করে জামিন পাওয়া জঙ্গি সদস্যের খোঁজ করেন। এক্ষেত্রে থানা পুলিশের বিভিন্ন বিটের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের সহায়তা নিয়ে থাকেন।

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের গোয়েন্দা সেলের বিশেষ পুলিশ সুপার হাসানুল জাহিদ বলেন, ‘আমরা জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়মিত মনিটরিং করে থাকি। একই সঙ্গে তাদের ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশনের কাজ করছি। জামিনে বের হয়ে এসে যাতে নতুন করে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে না পারে, বা সংগঠিত হতে না পারে, তা নজরদারি করা হচ্ছে।’

তবে জঙ্গিবাদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন এমন বিশ্লেষকরা বলছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়মিত নজরদারির কথা বলা হলেও তা আসলে অপ্রতুল। তা না-হলে আমরা মাঝে মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই এমন জঙ্গি সদস্য গ্রেফতার হচ্ছে, যারা আগেও গ্রেফতার হয়ে জেলখানায় ছিল। জামিনে বের হয়ে এসে আবারও জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যমসারির একাধিক কর্মকর্তাও বলছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের শতভাগ নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে যারা একটু নেতা টাইপের, তাদেরকে নজরদারি করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ছোট-খাটো বা সদস্য পর্যায়ের ব্যক্তিদের নজরদারি করা যায় না। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে গঠিত বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর এত জনবল নেই।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওই কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট জঙ্গিবাদ দমনে সফল হলেও তাদের অধিক্ষেত্র হলো রাজধানী ঢাকার মধ্যে। ঢাকার বাইরে অপারেশন করতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ বা পুলিশ সদর দফতরের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর সারা দেশের জঙ্গিবাদ দমনে ২০১৮ সালে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হলেও এখনও জনবল সংকটের কারণে তারা প্রত্যেক জেলায় জেলায় কার্যক্রম চালাতে পারছে না। ঢাকা থেকে টিম পাঠিয়ে তাদের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক নূর খান লিটন বলেন, ‘জামিনে থাকা জঙ্গিদের সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। বিশেষ করে যারা সুপথে ফিরতে চায় তাদের সমাজে রি-এস্টাব্লিস্টমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য ডেডিকেটেডভাবে কোনও একটি সংস্থাকে কাজ করতে হবে। জঙ্গিবাদ দমনে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও দেখা যায়। জঙ্গিবাদ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে।’

/এপিএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চিপ উৎপাদন এবং বিজ্ঞানে বিনিয়োগ বাড়ানোর নির্দেশে স্বাক্ষর বাইডেনের
চিপ উৎপাদন এবং বিজ্ঞানে বিনিয়োগ বাড়ানোর নির্দেশে স্বাক্ষর বাইডেনের
অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর সন্তান জন্মদান, অভিভাবকদের হাইকোর্টে তলব
অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর সন্তান জন্মদান, অভিভাবকদের হাইকোর্টে তলব
হোয়াইটওয়াশ এড়াতে পারবে বাংলাদেশ?
হোয়াইটওয়াশ এড়াতে পারবে বাংলাদেশ?
দ্রুতযান এক্সপ্রেস থেকে নামার সময় কাটা পড়ে মৃত্যু
দ্রুতযান এক্সপ্রেস থেকে নামার সময় কাটা পড়ে মৃত্যু
এ বিভাগের সর্বশেষ
জঙ্গিমুক্ত দেশ চায় সালাউদ্দিনের পরিবার: স্ত্রী রেমকিন
জঙ্গিমুক্ত দেশ চায় সালাউদ্দিনের পরিবার: স্ত্রী রেমকিন
ফুলেল শ্রদ্ধায় হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ
ফুলেল শ্রদ্ধায় হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ
জঙ্গিদের সুপথে ফেরানো ও সচেতনতা কার্যক্রম কতদূর?
জঙ্গিদের সুপথে ফেরানো ও সচেতনতা কার্যক্রম কতদূর?
‌‘আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না’ 
‌‘আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না’ 
‘হলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গি দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বেড়েছে’
‘হলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গি দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বেড়েছে’