কলকাতার নতুন পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব নিয়েছেন রাজীব কুমার। ‘রাজীব কলকাতার সিপি হওয়া মানে বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীদের জন্য বড় বিপদ। তিনি বেছে বেছে ওদের সবাইকে ধরবেন। এই ব্যাপারে তার দক্ষতা বলার অপেক্ষা রাখে না।’ রাজীবের চেয়ে কয়েক বছরের সিনিয়র পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক কর্মকর্তা এসব কথা বলেন।
৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারে পূর্বসুরি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থের কাছ থেকে রাজীব কুমার নতুন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। নতুন পদে বসেই তিনি জরুরি ও বিস্তারিত বৈঠক করেছেন ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব স্বস্তি দেওয়া, তাদের অসুবিধে দূর করা।
পুলিশের সদর দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজীব কুমার নিজের বাহিনী তো বটেই, অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থায় তার আস্থাভাজন কয়েকজন অফিসারের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্তত দুই-তিন জন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসীকে যত দ্রুত সম্ভব ধরার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন।
বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দারা ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ-কে ৩০ জন সন্ত্রাসীর একটি তালিকা দিয়েছে। বাংলাদেশের এসব ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসীরা ভারতে লুকিয়ে আছে বলে সে দেশের গোয়েন্দাদের দাবি এবং ওই সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই আত্মগোপন করে আছে পশ্চিমবঙ্গে। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, কলকাতার নতুন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার মূলত ওই তালিকা ধরেই এগোচ্ছেন।
এনআইএর এক কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের ধরার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে রাজীব কুমারকে সে দেশের গোয়েন্দাদের উপর নির্ভর না করলেও চলে। কারণ, বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের খবরাখবর সংগ্রহের জন্য তার নিজস্ব একটা সমান্তরাল নেটওয়ার্ক রয়েছে।’ ওই কর্মকর্তার মতে, নিখুঁত নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে রাজীব একের পর এক সাফল্য পেয়েছেন।
গত এক বছর রাজীব কুমার ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অপরাধ দমন বিভাগ বা সিআইডি’র এডিজি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, রাজীব ওই পদে যাওয়ার পর সিআইডির অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড প্রচণ্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বহু বাংলাদেশি সন্ত্রাসীকে পাকড়াও করে তারা বাংলাদেশের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।
২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে একটি বিস্ফোরণ হয় এবং ওই ঘটনার তদন্তেই পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে ভারতে জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর বিশাল সাংগঠনিক অস্তিত্বের তথ্য বেরিয়ে পড়ে। ওই ঘটনার তদন্ত করছে এনআইএ।
কিন্তু খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে এনআইএ যাকে জেএমবির প্রধান হিসেবে অভিহিত করেছিল, সেই বাংলাদেশি সন্ত্রাসী সাজিদ ওরফে শেখ রহমতুল্লাকে ধরেছিলেন রাজীব কুমারই। তিনি তখন বিধান নগরের পুলিশ কমিশনার ছিলেন। রাজীবের গড়া পুলিশের বিশেষ দল মুর্শিদাবাদের ফারাক্কার কাছ থেকে সাজিদকে পাকড়াও করেছিল। যদিও সরকারিভাবে দেখানো হয়, সাজিদ ধরা পড়েছে কলকাতা বিমানবন্দরের কাছ থেকে।
২০০৭ সালের ঘটনা। রাজীব তখন সিআইডির ডিআইজি (অপারেশনস)। সেই সময়ে তিনি কলকাতার উত্তরে বাগুইআটির একটি ফ্ল্যাট থেকে ধরেছিলেন বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্তাসী তানভিরুল ইসলাম ওরফে জয়কে। বাংলাদেশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘আপনাদের কাছে যেমন দাউদ ইব্রাহিম, আমাদের কাছে তেমনি জয়।’ সন্ত্রাসী জয় বাগুইআটিতে বসে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশের চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের কাছে ফোনে টাকা চেয়ে হুমকি দিতো বলে পুলিশ অভিযোগ পেয়েছিল।
পরের বছর রাজীব কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর প্রধান হন। আর ২০০৮-এর অক্টোবরেই কলকাতার পাম অ্যাভিনিউ থেকে ধরা পড়ে বাংলাদেশের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন।
শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের নাগরিক ও ভারতে জঙ্গি হামলায় অভিযুক্ত নাফিস, বাকি ও মধু’র মতো হরকত উল জিহাদ ইসলামির (হুজি) সদস্যরাও ধরা পড়েছিল কলকাতার এসটিএফ প্রধান রাজীব কুমারের জন্য। ওই জঙ্গিরা হায়দরাবাদে পুলিশের একটি অফিসে আত্মঘাতি হামলা চালিয়েছিল। যেখানে সুইসাইড বোম্বার ছিল মুস্তাকিম বিলা।
গত বছর বলিউডের একটি স্পাই থ্রিলার ছবি মুক্তি পেয়েছে। অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘বেবি’। যাতে সন্ত্রাসবাদিদের হোতা মাওলানাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পড়িয়ে অন্য দেশ থেকে ভারতে নিয়ে আসার কাহিনী রয়েছে । কলকাতা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজীব কুমারের আমলে কলকাতা এসটিএফের কাজ বাস্তবে রুপালি পর্দার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। আমরা বাংলাদেশ থেকে একাধিক সন্দেহভাজন জঙ্গিকে ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পড়িয়ে কলকাতায় নিয়ে এসেছি।’
সেই রাজীব কুমার এখন কলকাতা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা। ‘বাংলাদেশি সন্ত্রাসীদের বিপদ তো হবেই,’ বলছেন লালবাজারের বেশিরভাগ পুলিশ কর্মকর্তা।
এপিএইচ/








