প্রসূতি অবস্থায় পারভীন আক্তার আলট্রাসনোগ্রামে জেনেছিলেন তার ছেলে হবে। গর্ভকালীন সময়ে তার শারীরিক অবস্থা ঠিকই ছিল। অবশেষে একবুক আশা নিয়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে প্রসব বেদনা নিয়ে কেরানীগঞ্জের বসিলা থেকে মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (এমএমএসটিসি) নামের হাসপাতালটিতে আসেন তিনি। তার স্বামীর দাবি, হাসপাতালে আসার ১৫ মিনিটের মধ্যেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তানের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক শিশুর বদলে হাসপাতালটির চিকিৎসকরা তাদের হাতে তুলে দেন একটি মৃত শিশু। তাও আবার সেটি মেয়ে। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নবজাতক পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে।
যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, পারভীন আক্তার মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। বাচ্চাটি গর্ভেই মারা গেছে।
প্রসূতির স্বামী শামসুল ইসলাম জানান, সকাল ৬টার দিকে তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হয়। এরপর বাসা থেকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে পাশের বাসার দুই নারীসহ আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে একটি সিএনজিতে করে এই হাসপাতালে আসি। স্ত্রীকে হাসপাতালের তিন তলায় ডেলিভারি কক্ষের ভেতরে দিয়ে আমি বাইরে যাই। এখানে আমাদের সঙ্গে আসা অন্য দুই নারী ছিল। ডেলিভারির পর তারা সেখানকার আয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। যদিও আয়া একেক সময় একেক তথ্য জানাচ্ছিলেন তাদের।
যে দুই নারী লেবার ওয়ার্ডের সামনে ছিলেন তাদের বরাত দিয়ে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আয়া প্রথমে আমাদের জানিয়েছে ছেলে বাচ্চা হয়েছে। এরপর বলে মেয়ে বাচ্চা হয়েছে।তার কিছুক্ষণ পর বলে মৃত মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। তবে এসময় আমি এখানে ছিলাম না। এরপর তারা ভেতরে গিয়ে মৃত মেয়ে বাচ্চা দেখতে পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী নয় মাস ধরে এখানেই চিকিৎসা করাতেন। তবে এরমধ্যে আমরা বাইরের একটি ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি (জিএসসি) করিয়েছি। সেখান থেকে আমাদের ছেলে বাচ্চা হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখনতো দেখি মৃত মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। এতেই আমাদের সন্দেহ তৈরি হয়েছে।’
শামসুল আরও জানান, এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় সন্তান। তার বড়ছেলের বয়স ৮ বছর। তাদের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল। তিনি ক্ষুদ্রব্যবসায়ী।
শামসুল হকের সঙ্গে আসা তার প্রতিবেশী সুলতানা বেগম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অপারেসন থিয়েটার থেকে আয়া বের হলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করছি, ছেলে বাচ্চা হয়েছে? তিনি ‘হুম’ বলেছেন। এরপর শুনি পারভীনের মৃত মেয়ে বাচ্চা হয়েছে।’
এদিকে এ বিষয়ে হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান সিদ্দীকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা নিছক ভুল বোঝাবুঝি। না জেনেই তারা এই অভিযোগ করেছেন। এই হাসপাতালে সব শ্রেণির মানুষ সেবা নেয়। এরকম অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। এই নারী দীর্ঘ নয় মাস ধরে এখানে চিকিৎসা নিয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি সর্বশেষ নিয়মিত পরীক্ষার জন্য আসছিল। তাকে তিন দিন পর আসতে বলা হয়েছিল। তিনি আসেননি। আজকে খুব ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি এসেছেন। আমাদের এখানে প্রতিমাসে চার পাঁচশ’ প্রসূতির প্রসব করানো হয়। গত পাঁচ বছর ধরে মানুষ এখানে ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে। গত মাসেও ৩৫১টি শিশু প্রসব করানো হয়েছে। এরমধ্যে ৯১টি সিজারিয়ান ছিল।’
পারভীন আক্তারের প্রসবের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক হেলেন জীবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খুব গুরুতর অবস্থায় ওই নারী হাসপাতালে এসেছিল। তার পানি ভেঙে ছিল অনেক আগে। বাচ্চাটি ভেতরে পানি শূন্যতায় ছিল। হাসপাতালের লিফটে আমার সঙ্গে ওই প্রসূতি মায়ের দেখা হয়। আমি তাকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যেতে বলি। তার ভালো করতে গিয়ে এখন আমার খারাপ হয়ে গেল। আসার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রসব করানো হয়। বাচ্চা প্রসবের পর দেখি বাচ্চাটির কোনও হার্টবিট নেই। বাচ্চার কোনও কিছুই কাজ করছিল না। বেশ কিছুক্ষণ আমরা শিশুটিকে পর্যবেক্ষণ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই নারী গত ৯ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ হাসপাতালে এসেছিল। এরপর তাকে তিনদিন পর হাসপাতালে আসতে বলি। কিন্তু তিনি আসেননি। আমাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা দুঃখজনক।’
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) হাফিজ আল ফারুক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রসূতি নারীর স্বজনদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এমনিতেই এসেছি।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত ওই নারীসহ দুজনের সন্তান প্রসব করানো হয়েছে। এরমধ্যে পারভীনের মৃত মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। অপরটি এক দম্পতির ছেলে সন্তান হয়েছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত সাতটি নবজাতকের জন্ম হয়েছে।
/এআরআর/এসএম/ টিএন/








