দলের প্রচার, প্রভাব বিস্তারসহ রাজনৈতিক কাজে মসজিদগুলোকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি দলীয় লোক নিয়ন্ত্রিত সারাদেশের মসজিদগুলোকে যেন জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে তা নজর রাখতে বলা হয়েছে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটি থেকে জামায়াত ঘেঁষাদের বাদ দেওয়ার সুপারিশও করেছেন তারা। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিটিগুলোকে নজরদারিতে রাখা হবে।
প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সে অনুযায়ী, সারাদেশের মসজিদগুলোর কমিটির সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় ও তালিকা তৈরি করছেন গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা- মসজিদের উন্নয়নে কৌশলে নামে-বেনামে আর্থিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন জামায়াতের নেতা ও সমর্থকরা। এক সময় তাদের পরিচয় প্রকাশ পেলেও আর্থিক নির্ভরতার কারণে তাদের সঙ্গে বিরোধে যান না কমিটির অন্য সদস্যরা। ফলে জামায়াতের নেতা ও সমর্থকরা জায়গা করে নিচ্ছেন মসজিদ কমিটিতে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর আদাবরের ঢাকা হাউজিং জামে মসজিদের কমিটি ২৯ সদস্যের। এর মধ্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরসহ ছয়জন জামায়াত সমর্থক ও দাতা রয়েছেন।এরা হলেন জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক প্রকৌশলী আকবর হোসেন, কামাল হোসেন খান, শামীম মৃধা,মাসুদুর রহমান, প্রকৌশলী আব্দুস সালাম। এর মধ্যে শামীম মৃধা হলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আসামি ইস্কান্দার মৃধার ছেলে। এছাড়া, শামীম মৃধার ভগ্নিপতি ইঞ্জিনিরয়ার আবদুল জব্বার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক রয়েছেন।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই মসজিদ কমিটিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সহ-সভাপতির দায়িত্বে আছেন। কমিটির সভাপতি সাবেক ডেপুটি স্পিকার আকতা্র হামিদ, এছাড়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও এই মসজিদ কমিটির সদস্য।
মসজিদে খতিবের দায়িত্বে আছেন মাওলানা মোহাম্মদ নূর, তিনিও জামায়াতের সমর্থক। আর মোয়াজ্জেম হাফেজ হেলালও জামায়াতের কর্মী। এর আগে তিনি একটি মামলায় তিন মাস জেলে থেকে বর্তমানে জামিনে আছেন। এই মসজিদে বিভিন্ন সময় বৈঠক করেন জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। এছাড়া জামায়াতের পলাতক নেতাকর্মীরা এ মসজিদে আশ্রয় নেন বলেও জানা গেছে।
রাজধানীর আদাবরের ঢাকা হাউজিং জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ নূর নিজেকে জামায়াতের সমর্থক নন বলে দাবি করেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি কোনও দল করি না। তবে মসজিদ কমিটিতে জামায়াতের লোকজন আছেন। মসজিদের মোয়াজ্জেম হাফেজ হেলালও জামায়াতের কর্মী কিনা জানি না, তবে তাকে এক মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। আমি নামাজ পড়াই এর বাইরে কিছুই জানি না।
জানা গেছে, শ্যামলী শাহী মসজিদের কমিটি ২০ সদস্যের। এর মধ্যে কমিটির সাধারণ সম্পাদকসহ দু’জন জামায়াতের সমর্থক। মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম ও সদস্য হাজি করিম স্থানীয় জামায়াতের নেতা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন মতে, লালমাটিয়া শাহী মসজিদ কমপ্লেক্স কমিটিও রয়েছে জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। মসজিদ ও মাদ্রাসার সমন্বয়ে এই কমপ্লেক্সের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকসহ তিনজন জামায়াত নেতা রয়েছেন। কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহসান কবির পানু, মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী, ক্বারি মুজাফ্ফর জামায়াতের নেতা। এই মসজিদটি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মালিকাধীন হলেও মসজিদ কমিটিতে থাকার সুবাধে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন জামায়াতপন্থীরা। মসজিদ সংলগ্ন পুকুরটিও ভরাট করা হচ্ছে অবৈধভাবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, শুধু রাজধানীতে মসজিদ রয়েছে প্রায় ৬ হাজার। সর্বশেষ ২০০৮ সালের এক জরিপে এ সংখ্যা বলা হয় ৫৭৭৬টি। ওই জরিপ অনুযায়ী সারাদেশে মসজিদ সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৯৯।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মসজিদ কমিটিতে জঙ্গি মনোভাব সম্পন্ন কোনও ব্যক্তি বা জামায়াতে সমর্থক বা দলের নেতাকর্মীদের কেউ যুক্ত আছেন কিনা- এ নিয়ে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শেষ হয়েছে। সে তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা অনুযায়ী কমিটিগুলোর কার্যক্রম, চিহ্নিত ব্যক্তিদের দিনলিপিসহ বিভিন্ন সন্দেহজনক বিষয়গুলো পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে মসজিদের ভেতরেই দলের গোপন বৈঠক সারছেন জামায়াত নেতারা। বিভিন্ন সময়ে মসজিদের ভেতরে বৈঠক করার সময়ও আটক হয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ গত বছর ৩১ আগস্ট রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাঘা পৌর এলাকার ছাতারী মধ্যপাড়ার মসজিদে গোপন বৈঠক করছে এমন খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে পৌর জামায়াতের আমির অধ্যাপক সাইফুল ইসলামসহ ৬২ জনকে আটক করে থানা পুলিশ।
তবে উত্তরা এক নম্বর সেক্টর জামে মসজিদের কমিটিতে সভাপতি হিসেবে আছেন আলহাজ আবদুশ শাকুর। তিনি হাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সেক্রেটারি হিসেবে আছেন আলহাজ আবদুর রহমান- তিনি রাজউকের সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। এ দুজনেই সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন।
এই মসজিদের একজন দায়িত্বশীল জানান, কিছুদিন আগে পুলিশের পক্ষ থেকে এই মসজিদ কমিটির তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান (ডিআইজি) মনিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জঙ্গিবাদের সঙ্গে জামায়াতের কেউ সম্পৃক্ত আছে কিনা আমরা সেটা দেখার চেষ্টা করছি। এজন্য গোপনে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া জামায়াতের কেউ মসজিদের ইমাম হলে খুতবায় রাষ্ট্র বা সরকারবিরোধী বা উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয় কিনা তা দেখা হচ্ছে। আর জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে পেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। মসজিদ কমিটিতে কারা আছেন সেটারও তথ্য থাকবে। মূল বিষয় হচ্ছে,মসজিদ সংশ্লিষ্ট কেউ জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে উস্কানি বা সহায়তা যেন না করতে পারে সেদিকে নজর রাখা।
দেশব্যাপী মসজিদ কমিটির খোঁজে গোয়েন্দারা
/সিএ/এএইচ/এপিএইচ/








