সুদানে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। এর মধ্যেই সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার কথা ভেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশটিতে থেকে যেতে চাচ্ছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদ। ১৫ এপ্রিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিনই সুদানে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতের বাসা আক্রান্ত হয়। বাসার দেয়াল ও জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়ে মেশিনগানের গুলি। ওই অবস্থায় নিজের পরিবার নিয়ে খার্তুম থেকে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে হয়েছে তাকে। তবে সুদানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একজনও বাংলাদেশি যে চলে যেতে আগ্রহী, ওই ব্যক্তি না যাওয়া পর্যন্ত আমি থাকতে চাই। আমি ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে জানিয়েছি।’
১৫ এপ্রিল বিবদমান পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন রাষ্ট্রদূতের বাসা আক্রান্ত হয়। রাষ্ট্রদূতের বাসা আমারাত জেলায় অবস্থিত এবং এলাকাটি নিরাপদ ছিল না।
তিনি বলেন, আমার বাসার পাশে বিমানবন্দরের মধ্যে মিলিটারি এয়ারবেস আছে। সে কারণে এখানে মারাত্মক যুদ্ধ হয়েছে। আমাদের মার্কিন দূতাবাস থেকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ দূতাবাসের সব কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি তাদের জানিয়েছি যে আমার যাওয়ার কোনও আগ্রহ নেই। তবে তারা যদি আমাদের পরিবারের নারী সদস্যদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে পারে তবে আমরা আরও ভালোমতো কাজ করতে পারবো। আমি আশা করছি এখানে আমাদের তিন নারী সদস্যকে তারা দ্রুত এখান থেকে নিয়ে যাবে।
সিকিউরিটি কোর
সুদানে বড় দূতাবাসগুলোর একটি সিকিউরিটি কোর (নিরাপত্তা জোট) আছে এবং যুক্তরাজ্য দূতাবাসের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সেটির সমন্বয়ক।
রাষ্ট্রদূত জানান, ‘প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো থাকার কারণে আমি নিরাপত্তা বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতাম। আমি জানতে পারতাম কোন এলাকা নিরাপদ এবং কোন এলাকা নয়।’
তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার (২০ এপ্রিল) বিকালে আমাকে বলা হলো বাড়ি থেকে আধা ঘণ্টার মধ্যে বের হয়ে যেতে এবং আমরা বস্তুতপক্ষে এক কাপড়ে বাসা ত্যাগ করি। আমরা শুধু আমার ড্রাইভার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি।
জীবনের ঝুঁকি
নিজের বাসা থেকে বের হলেও খার্তুম শহর থেকে বের হওয়ার কোনও উপায় ছিল না বলে জানান তারেক আহমেদ। রাষ্ট্রদূত বের হওয়ার পরে বুঝেছেন আমারাত এলাকায় কোনও লোক নেই, পুরোটাই ছিল জনশূন্য।
রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদ বলেন, যেদিকে গেছি সেদিকেই রাস্তা বন্ধ। এরমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দূতাবাসের অন্য যে দুই কর্মকর্তা আছে তাদের বাসায় আশ্রয় নেই এবং পরে অন্য নিরাপদ জায়গায় চলে যাবো। তাদের বাসা শহরের মধ্যে, কিন্তু যুদ্ধ আক্রান্ত এলাকা থেকে কিছুটা দূরে।
ওই কর্মকর্তাদের বাসায় যাওয়ার সময় আমাদের ২০ থেকে ২৫ জায়গায় গাড়ি থামানো হয়েছে। একটি জায়গায় আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম এবং মনে হচ্ছিল আমাদের গুলি করা হবে। ওই জায়গায় আমাদের গাড়ি থেকে নামতে বলা হয় এবং আমার ও আমার ড্রাইভারের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। গাড়িতে যা জিনিস ছিল সব নামিয়ে ফেলে।’
রাষ্ট্রদূত বলেন, এর একদিন আগে মালয়েশিয়ান দূতাবাসের একটি গাড়ি যেখানে পাঁচ কর্মকর্তা ছিলেন তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল এবং তাদের গাড়ি নিয়ে নিয়েছিল। এটি আমি জানতাম। ফলে ভয় কিছুটা বেশি ছিল। ওই পরিস্থিতিতে আমার ড্রাইভার বুদ্ধি করে আমার পরিচয় দিলো যে আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং তখন তারা আমাদের মোবাইল ফেরত দেয় এবং গাড়িসহ ছেড়ে দেয়। আমরা যখন ওই কর্মকর্তাদের বাসায় পৌঁছালাম, তখন আধাঘণ্টা আমরা কোনও কথা বলতে পারিনি ভয়ের জন্য।
শুক্রবার ঈদের দিন
ঈদের দিনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, সকালে চিন্তা করলাম সেদিন গোলাগুলি কম হবে এবং এই সুযোগে বাসা থেকে কিছু জিনিস এবং দূতাবাস থেকে পাসপোর্টগুলো সংগ্রহ করার জন্য।
রাষ্ট্রদূত বলেন, আমার কর্মকর্তা গাড়ির ড্রাইভার নিয়ে রওনা হওয়ার পরে আমার বাসা বা দূতাবাসের কাছেও যেতে পারেননি। সারাদিন শহরের বাইরে একটি জায়গায় নিরাপদ অবস্থানে ছিলেন তারা। পরের দিন তারা বাসায় ফিরেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের কর্মকর্তাদের যে বিল্ডিংয়ে বাসা সেখানে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের বাসা এবং তারা সবাই খার্তুম ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পুরো বিল্ডিংটা একদিনে খালি হয়ে যায়। তখন শুধু আমরা একা ছিলাম। তারা ৫০টি বাস ভাড়া করে তাদের কর্মকর্তাদের খার্তুম থেকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলে।
জাজিরায় আশ্রয়
রাষ্ট্রদূত জানান, আমাদের বলা হলো শনিবার জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। ফলে গোলাগুলি কম হবে এবং আমরা যেন শহর ত্যাগ করি।
তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তুতি না থাকার কারণে আমরা সোমবার শহর ত্যাগ করি। আমরা একটি পুরনো গাড়ি ভাড়া করি যাতে করে সবাই মনে করে আমরা খুব সাধারণ একজন লোক। আমাদের তিন কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারসহ মোট সাত জন আমরা গাড়িতে করে একটি বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখান থেকে জাজিরা প্রদেশের রাজধানী মাদানি শহরে চলে আসি।
মাদানি শহরে একজন বাংলাদেশি যার নাম আবুল খায়ের, একটি কটন শিল্পের মালিক এবং সেখানে আশ্রয় নিয়েছি, বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
বর্তমান পরিস্থিতি
আগ্রহী বাংলাদেশিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে দূতাবাস। রাষ্ট্রদূত জানান যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশিদের মধ্যে ফর্ম বিলি করা হয়েছে এবং তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বাস ভাড়া করার চেষ্টা করা হচ্ছে।









