২৪ এপ্রিল প্রকাশিত অ্যামনেস্টির ২০১৫/২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে,বাংলাদেশে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ক্ষুণ্ন করা হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। প্রতিবেদনে ব্লগার হত্যা, প্রকাশকের ওপর হামলা, মৃত্যুদণ্ড, গুম, নারীর প্রতি সহিংসতা, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। অতীতের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের সুমহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্ট এবং যথার্থ তথ্যের অনুপস্থিতিকে এই প্রতিবেদনেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে অ্যামনেস্টি।
৪০৮ পৃষ্ঠার ওই বার্ষিক প্রতিবেদনের ৮২ এবং ৮৩ নম্বর পাতায় বাংলাদেশের প্রসঙ্গ ধরে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের পটভূমিকায় উঠে এসেছে ২০১৫ সালের শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সহিংস আন্দোলনের প্রসঙ্গ। এতে বলা হয়েছে, বছরের শুরুতেই জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বিরোধী জোটের আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে বিভিন্ন যানবাহনে ছোঁড়া পেট্রোল বোমায় বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি হয়েছে, আহত হয়েছেন অনেকে। তবে এসব ঘটনার দায়ে সরাসরি জড়িত কাউকেই বিচারের আওতায় নেওয়া হয়নি। তবে আগুন দেওয়ার দায়ে করা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বেশকিছু শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে আটক রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনের পটভূমিকায় ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বরের মধ্যে দুই বিদেশি নাগরিক খুন এবং একজনের ওপর হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া রাজন হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে অ্যামনেস্টির ওই বার্ষিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের `মতপ্রকাশের স্বাধীনতা' অংশে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের বিজ্ঞাপন বন্ধে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের তরফ থেকে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হয়েছে। উঠে এসেছে বাংলাদেশে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নিবন্ধন বাতিল করার সংসদীয় প্রস্তাবের প্রসঙ্গ। সুশীল সমাজের ৪৯ প্রতিনিধির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা, নভেম্বরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রাখা, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে সেক্যুলার ব্লগার অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমান, নিলয় নীল ও অনন্ত বিজয় দাশ হত্যা এবং অক্টোবরে লেখক-প্রকাশকের ওপর হামলার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে অ্যামনেস্টির ওই বার্ষিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও ব্লগার-লেখকদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনেছেন। সবমিলে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে,এসবের মধ্যদিয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত এসেছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
প্রতিবেদনের গুম নিয়ে তৈরি করা অংশে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বরাতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর নাগাদ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৪৩ জনের গুম হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এদের মধ্যে ৬ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, ৪ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং ৫ জনকে পুলিশি হেফাজতে পাওয়া গেছে। বাকি ২৮ জনের হদিস পাওয়া যায়নি। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার বিচার কাজ চলছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে আর কোন গুমের ঘটনায় কাউকে বিচারের আওতায় নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনের 'নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুরতা' অংশে দাবি করা হয়েছে, পুলিশি হেফাজতে বহু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনা কখনও তদন্ত করে দেখা হয়নি। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে এক সরকারি স্মারকের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষণের মধ্যদিয়ে সেখানকার 'আদিবাসী' নাগরিকদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের 'নারীর প্রতি সহিংসতা' অংশে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ২৪০টি ধর্ষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে, তবে এসব ঘটনার বিচার খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। সময়োপযোগী ও কার্যকর তদন্তের অভাবেই এমনটা ঘটেছে বলে দাবি করেছে অ্যামনেস্টি।
প্রতিবেদনের সবশেষ অংশে আলোচনা করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গ নিয়ে। এ বছর ১৯৮ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৩ সালে বাবা-মাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ঐশি রহমানের আইনজীবীদের তরফে তার বয়স ১৮ বলা হলেও এক মেডিক্যাল রিপোর্টের মাধ্যমে তাকে ১৯ বছর বয়সী সাব্যস্ত করে তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে। এতে দাবি করা হয়েছে, অ্যামনেস্টিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক চম্পা প্যাটেলের দাবি, বাংলাদেশের জনগণের জীবন নিয়ে খেলছে সরকার। তিনি বলেন, 'ধর্মান্ধ শক্তির হাত থেকে সেক্যুলার ব্লগারদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে।' তিনি মন্তব্য করেন,এদের সুরক্ষা দেওয়া সরকারের কর্তব্য।
/বিএ/এমএসএম








