জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা এনে দেওয়ার পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তবে সে কাজে সম্পদ আর দক্ষ জনবলের অভাবের পাশাপাশি অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় দুর্নীতি। এসময় দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার সংগ্রামের পাশাপাশি ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রামের ডাক দেন তিনি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু কতটা সোচ্চার ছিলেন, তা আলোচনায় এসেছে সামান্যই। বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণ বয়স থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যন্ত সোচ্চার ছিলেন তিনি। দুর্নীতিকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন জাতির পিতা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগের সময়গুলোতে দেখা যায়—বেশ কয়েকটি বড় দুর্নীতির ঘটনা সামনে আসে এবং ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তারা বলছেন, দেশব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার যে অবস্থান, সেটি তাকে ‘অজনপ্রিয়’ করে তুলেছিল। তিনি নিজে একাধিকবার বলেছেন— ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।’
রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রতি সমূলে দুর্নীতি উৎখাতের তীব্র অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন। ১৯৭৫ সালের ২২ জুলাইয়ের পত্রিকায় তাঁর সেই নির্দেশের খবর ছাপা হয়। গভর্নরদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের অবশ্যই স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত এবং অন্যান্য ধরনের দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।’ নবনিযুক্ত গভর্নরদের জন্য বঙ্গভবনে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কোর্স উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সমাজ থেকে উৎকোচ ও দুর্নীতি উচ্ছেদের উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘প্রত্যেকের ওপরই আমার আস্থা আছে। যারা আমার আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তারা এ কাজ সমাধা করতে পারবেন।’
১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয় ৬০ লাখ টাকার সিমেন্ট কেলেঙ্কারির খবর। টিসিবির একজন অফিসারসহ তিন জন গ্রেফতার হয়। টিসিবির ৬শ’ টন সিমেন্ট আত্মসাতের অভিযোগে সংস্থাটির জনৈক নির্বাহী কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই ৬শ’ টন সিমেন্টের সরকারি মূল্য ৬০ লাখ ২৭ হাজার ৫০শ’ টাকা। সূত্র জানায়, ঢাকা জেলার অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার আট জন ডিলারকে ৭৫ টন করে মোট ৬শ’ টন সিমেন্ট বরাদ্দ করেন। এরপর প্রত্যেক ডিলারকে টিসিবির অনুমোদিত ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে বরাদ্দকৃত সিমেন্ট ডেলিভারি নেওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাংকে টাকা জমা না দিয়ে টিসিবির দুজন পদস্থ কর্মকর্তার যোগসাজশে ভুয়া রসিদ সংগ্রহ করে বরাদ্দকৃত সিমেন্ট তুলে নেওয়া হয়।
৩ আগস্ট দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত প্রধান সংবাদ—‘৩২ লাখ টাকার সুতা কেলেঙ্কারি ধরা পড়েছে’। খবরে বলা হয়, এই কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে গেছে বিটিআইসি’র ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এরপর ৬ আগস্ট দৈনিক বাংলায় প্রথম পাতার প্রধান সংবাদ ছিল—‘৪৯ লাখ টাকার গম আত্মসাৎ’। বিদেশ থেকে আমদানি করা ৪৯ লাখ টাকা বেশি মূল্যের খাদ্যশস্য আত্মসাতের তিনটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে।
৯ আগস্টের দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম—‘শহীদদের পরিজনদের দেওয়া ২৭১টি চেক বেহাত, ৭ জন গ্রেফতার’। খবরে বলা হয়, মাত্র তিনটি জেলায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পরিবার-পরিজনকে দেওয়া ২৭১টি চেক বেহাত হয়েছে। বাকি ১৪৪টি দুষ্কৃতকারীরা জমা দেয়নি। ১২৭টি চেকের ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ এবং এ ব্যাপারে দায়ী ২৩ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন সংস্থা মামলা দায়ের করেছে। এরইমধ্যে সাত ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের জায়গায় চলে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে কারা ছিল, লক্ষ্য করলেই বিষয়গুলো পরিষ্কার হতে শুরু করে। যারা ধর্ম নিরপেক্ষতাকে মানতে পারেনি, যারা শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে ছিল, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেওয়া প্রত্যক্ষ পদক্ষেপগুলোর ভুক্তভোগী ছিল, তারা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। যারা দুর্নীতি করেছে, তারা সে সময় ক্ষমতাবান ছিল। বঙ্গবন্ধু নিজে বলেছেন—‘সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ সে সময়ের প্রতিটি জনসভায় বঙ্গবন্ধু বারবার দুর্নীতির রাস্তা ছেড়ে দেশ গঠনে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাতে খুনিরা ভেবেছিল—এভাবে চললে তারাও একসময় জেলে যাবে।’’








