কালরাত্রির নৃশংসতা স্মরণ এবং ইতিহাসের শিক্ষা

মফিদুল হক
২৫ মার্চ ২০২৬, ১০:০০ আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১৫:১৩

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা নিয়ে পাকিস্তান বাহিনী পূর্ববাংলাজুড়ে যে হত্যালীলা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে, তা ছিল ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার চরম উদাহরণের একটি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে ইহুদি নিধনে যে বর্বরতা ঘটিয়েছিল, হিটলারের ফ্যাসিস্ট জার্মান রাষ্ট্র তা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। হিটলার বাহিনীর পরাজয়ের পর ইতিহাসের শিক্ষাগ্রহণে ব্রতী হয়েছিল বিশ্বসমাজ। আওয়াজ উঠেছিল ‘নেভার এগেইন’, আর যেন এমন সর্বব্যাপী নৃশংসতার অবতারণা মানবসমাজকে দেখতে না হয়। ইউরোপজুড়ে ইহুদি ও অন্য জাতিসত্তার সদস্য এবং ভিন্নমতাবলম্বী মানুষদের পাইকারিভাবে নিধন পরিচিতি পেয়েছিল ‘হলোকাস্ট’ হিসেবে এবং নৃশংসতার কারণ ও কাঠামো অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করে প্রণীত হয়েছিল জেনোসাইডের সংজ্ঞা, তার জন্য দায়ীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের দাবি। তারপরও জেনোসাইড প্রতিরোধ করা যায়নি এবং বিশ্বসমাজও জেনোসাইডের জন্য বিচারের আয়োজন করতে দীর্ঘদিন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছিল। এরপর ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ তথা জেনোসাইড ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের আদালত গঠনে, এবং তারপরও বিশ্বসমাজ বিচারের উদাহরণ বিশেষ তৈরি করতে পারেনি।

বাংলাদেশ জেনোসাইডের শিকার এক জাতি ও রাষ্ট্র, পৃথিবীতে এমন দুর্ভাগা দেশ বেশি নেই। ২৫ মার্চের কালরাত্রিকে আমাদের এই নিরিখেই বিচার করতে হবে, যেখানে জেনোসাইডের ধরন ও প্রকৃতি অনুধাবন বিশেষ জরুরি। বাঙালির জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ক্রমান্বয়ে সংহত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যে বিপুল গণরায় অর্জন করেছিল— তা বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবকে বাঙালি জাতির বৈধ-নেতা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। পাকিস্তান গণপরিষদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিকভাবে বাঙালির পক্ষে শেখ মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলো, সেটা পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার নামে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তা ধর্মপরিচয়কে মুখ্য করে জাতিসত্তাকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যারা আসীন হয়েছিল, সেই ভূস্বামী-উঠতি ধনিকগোষ্ঠী-আমলা ও সামরিকচক্র নিজেদের আধিপত্য কায়েমি রাখতে ধর্মকে হাতিয়ার করে তুলেছিল, বলেছিল পাকিস্তান মুসলমানদের আবাসভূমি, হোমল্যান্ড অব দ্যা মুসলিম্স্ এবং মুসলমানরা হচ্ছে এক জাতি। এই মুসলিম নেশনহুডকে করা হয় পাকিস্তানের ভিত্তি, ইসলামের নামে যে ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে পাকিস্তান সেদিন যাত্রা শুরু করে, সেখানে বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার যেকোনও প্রয়াস তাদের জন্য দিল অশনী সংকেত। আর তাই তেমন প্রয়াসকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, ভারতের যোগসাজশ কিংবা হিন্দুদের কূটচাল হিসেবে বিবেচনা করতে তারা ছিল অভ্যস্থ এবং সেই বয়ান প্রচারে সিদ্ধহস্ত। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহারের এই প্রচেষ্টায় কেবল বাঙালি অবদমিত হয়নি, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানে পশতু, বেলুচ ও সিন্ধি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তাকেও অস্বীকৃত ও অবদমিত করে রাখা হয়। এর বিপরীতে বাঙালির জাগরণের রাজনৈতিক সমস্যাকে সামরিক শক্তিতে মোকাবিলা ও চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে সশস্ত্র অভিযানের পদক্ষেপ গ্রহণ করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং সেটাই বিস্ফোরিত হয় ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে।

গণহত্যা স্মরণ দিবসকে আমাদের কেবল ২৫ মার্চে কিংবা ঢাকাকেন্দ্রিক আয়োজনে সীমিত রাখলে, আমরা এর ব্যাপ্তি ও নির্মমতা অনুভব করতে পারবো না। এই আক্রমণ একযোগে পরিচালিত হয়েছিল সারা দেশে, যেখানে ক্যান্টনমেন্ট কিংবা সেনা গ্যারিসন ছিল, সেখান থেকেই সৈন্যরা দলে দলে বের হয়ে যথেচ্ছ হত্যাকাণ্ড শুরু করে, দেশব্যাপী তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়। ফলে একই ধাঁচের নির্মমতা ঘটে কুমিল্লা, যশোর, সিলেট, বগুড়াসহ আরো বিভিন্ন স্থানে। চট্টগ্রামে ও রংপুরে গোড়াতে পাকবাহিনী ছিল কিছুটা অবরুদ্ধ, তবে শিগগিরই উন্নত ও ভারী অস্ত্রের শক্তিতে তারা নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় একই মাত্রার হিংস্র আক্রমণ সংঘটিত করে। পরবর্তী ৯ মাস দেশজুড়ে চলে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, পীড়ন, ধর্ষণ ও পাইকারী আক্রমণাভিযান। বাঙালিমাত্রই তাদের আক্রমণের লক্ষ্য, আর বাঙালি হিন্দু হলে তো কথাই নেই। এই নিষ্ঠুরতা এক কোটি মানুষকে বাধ্য করে ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে নিঃস্বভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে। সেই শিবিরেও অগণিত মানুষ বিশেষভাবে শিশু ও বৃদ্ধ প্রাণ হারায় রোগে, অপুষ্টিতে, অর্ধ্বাহারে, সেটাও গণহত্যার শিকার হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে।

এই গণহত্যার হদিস আমাদের খুঁজে ফিরতে হবে নানাভাবে। জানতে হবে এর নানা দিক। কী ঘটেছিল সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে ঘটেছিল তার বিররণ তৈরি প্রয়োজন, তেমনই বুঝতে চেষ্টা করতে হবে, কেন এটা ঘটেছিল। বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইড অধ্যয়ন, এর কার্যকারণ অনুসন্ধান এবং বর্বরতা সংঘটনে ইন্ধন দিতে কোন আদর্শ  কাজ করেছে, সেসব তলিয়ে দেখা বিশেষ জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কাবুলে নির্বাসিত পাঠান-নেতা সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান বলেছিলেন যে, ধর্মের নামে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনে বাঙালিরা তো এই ধোঁকাবাজির পরিচয় নানাভাবে পেয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরদিন মর্নিং নিউজ পত্রিকা হেডলাইন করেছিল, ধোতিজ রোমিং ইন দ্য স্ট্রিটস্ অব ঢাকা, ঢাকার রাস্তায় ধুতি পরিহিতদের বিচরণ চলছে, যে সংবাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভাষা আন্দোলনের পেছনে ভারত ও হিন্দুদের অংশগ্রহণ দেখানো। বাঙালিদের পাকিস্তানি শাসকেরা যে ঊন-মানব হিসেবে বিবেচনা করেছিল তার উদাহরণ তো অজস্র রয়েছে। এসবের মাধ্যমে অপরের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা সঞ্চার করা হয়, সেটাই পরিণামে অপরের উৎসাদন বা এক্সটারমিনেশনে পরিণত হয়, জেনোসাইডের ভয়াবহতার রূপ নেয়। ধর্মের নামে এই বর্বরতা পূর্ববাংলায় ১৯৭১ সালে বিশ শতকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মুসলিম নিধনে রূপ নিয়েছিল। বসনিয়া নয়, বাংলাদেশেই ঘটেছিল এমন সর্বাত্মক মুসলিম নিধন, এবং তা ঘটিয়েছিল সর্বাংশে মুসলিমদের নিয়ে গঠিত পাকবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দ। আর তাই একথা গভীরভাবে ভাবার রয়েছে ইসলামের আদর্শের পতাকা হতে নিলেই কেউ প্রকৃত মুসলিম হয়ে ওঠে না, ইসলামের রক্ষক তো নয়ই, বরং এই গোষ্ঠীর হাতেই ঘটে ধর্মের চরম অবমূল্যায়ন, শান্তির ধর্মকে অধর্মে রূপান্তরের প্রক্রিয়া।

জেনোসাইড থেকে আমাদের তাই অনেক কিছু শেখার রয়েছে। শান্তি ও সম্প্রীতির সমাজ গড়বার উপাদান আমরা এখান থেকেই পেতে পারি। গণহত্যার ইতিহাসের কাছে আমরা দায়বদ্ধ, ইতিহাস জানা এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের নতুন প্রজন্মকে আগামীর পথে পা বাড়াতে হবে, মুক্ত হতে হবে ধর্মের নামে ধোঁকাবাজি থেকে।

লেখক: গবেষক, লেখক, প্রকাশক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘একজনেরও চাকরি থাকার কথা নয়’ একাত্তরের ‘ত্রুটিপূর্ণ’ মামলায় তোফাজ্জলের অব্যাহতি নিয়ে আদেশ ৩১ আগস্ট
সমালোচনার মুখে ‘৭১-এর চেয়ে ২৪ ওজনে ভারী’ শিল্পকর্ম সরিয়ে নিলো রাবি প্রশাসন
ফের আলোচনায় জামায়াতের ‘ক্ষমা প্রার্থনা’, কী ভাবছেন রাজনীতিকরা
সর্বশেষ খবর
২০২৬ সালে এসে পিসি রক্ষায় টাকা দিয়ে অ্যান্টিভাইরাস কেনা কি অপচয়?
২০২৬ সালে এসে পিসি রক্ষায় টাকা দিয়ে অ্যান্টিভাইরাস কেনা কি অপচয়?
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ম্যাচে রেফারিং নিয়ে সমালোচনা, শাস্তি পেলেন মিসরের কোচসহ ৩ জন
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ম্যাচে রেফারিং নিয়ে সমালোচনা, শাস্তি পেলেন মিসরের কোচসহ ৩ জন
পদ দেওয়ার কথা বলে টাকা-খাসি নেওয়ার অভিযোগ, বিএনপি নেতার অডিও ফাঁস
পদ দেওয়ার কথা বলে টাকা-খাসি নেওয়ার অভিযোগ, বিএনপি নেতার অডিও ফাঁস
৯/১১ হামলার মূলহোতার আপিল খারিজ করলো মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট
৯/১১ হামলার মূলহোতার আপিল খারিজ করলো মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট
সর্বাধিক পঠিত
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন