থমাস ডুলি। জাতীয় দলের হয়ে কোচ এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ম্যাচ পেয়েছেন। সান মারিনোর বিপক্ষে তাদের মাঠে জয় দিয়ে অভিষেক হয়েছে। এবার জার্মান কোচের সামনে ফিফা আসিয়ান কাপের মতো বড় পরীক্ষা। এরই মধ্যে সপ্তাহখানেক ধরে অনুশীলন চলছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও মিডিয়া সেশন হয়নি। অনুশীলন নিয়ে চলছে লুকোচুরি। এছাড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত খেলোয়াড়দের ট্রায়ালসহ নানান কথায় ৬৫ বছর বয়সী কোচ কিছুটা বিতর্ক জন্ম দিয়েছেন। এসব নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা সাবেক ফুটবলার।
বাংলা ট্রিবিউন: শুরুতে বিদেশভিত্তিক খেলোয়াড় প্রসঙ্গে জানতে চাই জাতীয় দলে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার জন্য কেন ট্রায়ালে আসতে হয়? কেউ যদি ক্লাব ফুটবলে ভালো খেলে, তবে তার কি সরাসরি সুযোগ পাওয়া উচিত নয়? সবাইকে কি ট্রায়াল দিতেই হবে? অন্য দেশগুলোতেও কি একই নিয়ম আছে?
ডুলি: আপনাকে ধন্যবাদ। আমি নিশ্চিত যে ফুটবল সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো জ্ঞান আছে। একটু ভেবে দেখুন, প্রতিটি আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়কেই কিন্তু এসে ট্রায়াল দিতে হয় না। খেলোয়াড়টি কোথায় খেলছে, সেটা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। ধরুন সুলিভানের কথা! কাভান সুলিভানের কি ট্রায়ালের প্রয়োজন আছে? অবশ্যই না! সে এমএলএস-এ খেলে এবং তার মার্কেট ভ্যালু ৫ মিলিয়ন ডলার। অপরদিকে ইংল্যান্ডের ৮ম স্তর লিগের একজন খেলোয়াড়, সেটা একটি সেমি-প্রো লিগ, যেখানে খেলোয়াড়রা চাকরি করার পাশাপাশি ফুটবল খেলে।
এর মানে কি এই যে, যে কেউ নিজেকে বর্তমান স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের চেয়ে সেরা মনে করলেই তাকে ডেকে এনে আমাদের খরচ বহন করতে হবে? আপনি কি সেটাই বলতে চাচ্ছেন? সত্যি?
কিছু খেলোয়াড় এসেছে, যেমন গোলকিপার সাইফ। অনুমান করুন তো, সিয়াটল থেকে বাংলাদেশে আসার ৪টি ফ্লাইটের খরচ কে দিচ্ছে! তাকে ৪টি বিমানে উঠতে হয়েছে এবং ৩ বার লে-ওভার বা বিরতি নিতে হয়েছে। এর খরচ কে দিয়েছে? সে নিজেই দিয়েছে। নতুন কোচিং স্টাফদের সামনে এসে নিজেকে প্রমাণ করতে চাওয়া এবং এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারাকে সে সম্মান মনে করে। আর সে যদি স্কোয়াডে জায়গা করে নিতে পারে, তবে তার টাকা ফেরত দেওয়া হবে! সারা বিশ্বেই এই নিয়ম চালু আছে!
অফিসিয়াল জাতীয় দলের কল-আপ এবং অফিসিয়াল জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমি সত্যি খুব চাই, যেসব সংবাদমাধ্যম এসব বোঝে, তারা বাইরে ছড়ানো এসব ভুল ধারণার পেছনে না ছুটে বাফুফের হয়ে কথা বলুক।
বাংলা ট্রিবিউন: সমালোচকরা বলছে, আপনি কেন বলছেন সবাইকে বিমান টিকিট দেওয়ার মতো টাকা বাফুফের নেই? আপনি তো কোচ। এসব কথা বলার জন্য তো কর্মকর্তারা আছেন।
ডুলি: কারণ আমি বাফুফেতে কাজ করি, গর্বের সঙ্গে বাফুফের হয়ে কাজ করি এবং বাফুফেকে কোনও মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে আমি তাদের পক্ষ নেবো! ভালো বলেছেন, মিডিয়ায় এমন উদ্ধৃতি দেখলে আমি সত্যিই খুশি হবো।
কেউ কি জানে এগুলোর পেছনে কেমন খরচ হয়? সমর্থকদের কোনও ধারণা নেই, তারা মনে করে প্রতিটি ফেডারেশনের কাছে এত টাকা আছে যে তারা জানেই না কী করবে।
ব্রাজিলের মতো দল অথবা আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা ইংল্যান্ডকে ঢাকায় এনে খেলানোর খরচ কত— সে সম্পর্কে কারও কোনও ধারণা আছে? তারা আসার সময় নিজেদের বাবুর্চি সঙ্গে নিয়ে আসে, যিনি হোটেলে রান্না করেন! তিনি একা নন, ব্রাজিল থেকে তার সঙ্গে আরও অন্তত ৩ জন সহকারী থাকেন। তারা যে হোটেলে থাকেন, সেখানে এক সপ্তাহ আগে থেকে গিয়ে রান্নাঘর তদারকি করেন এবং খাবার কেনেন। আর এই পুরো খরচ কে দেয় ভেবেছেন? ব্রাজিল?
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো বাফুফের কর্মকর্তাদের মতো মন্তব্য করছেন…
ডুলি: না। তবে আমি গত ৪৩ বছর ধরে এই পেশায় আছি এবং দেখছি কীভাবে কিছু অজ্ঞ মানুষ, যাদের কোনও ধারণা নেই অথচ জনমত বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, তারা এসব ছড়ায়।
এটা আমাকে খুব বিরক্ত করে।
অনেক ধরনের নির্বোধ মন্তব্য, প্রশ্ন এবং মানুষ সেগুলো বিশ্বাস করছে। বাংলাদেশ তো জার্মানি বা অন্যান্য বড় দেশের মতো নয়, যেখানে কোনও খেলোয়াড় নিজের টিকিটের টাকা দিয়ে জাতীয় দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে চাইলে মানুষ হেসে উড়িয়ে দেবে। সেখানে এমনটা কেন ঘটবে না জানেন? কারণ বিশ্বের সেরা লিগগুলোতে তাদের হাজার হাজার খেলোয়াড় খেলছে। সেখানে ৭ম ডিভিশনের কেউ এসে ফেডারেশনের খরচে ট্রায়াল দিতে চায় না।
বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে তো বাফুফের জাতীয় দলে জায়গা বা ট্রায়ালের জন্য নিয়ম করে দেওয়া উচিত…
ডুলি: আমাদের কোনও নিয়মের দরকার নেই, এটা একটা সাধারণ জ্ঞান।
বাংলা ট্রিবিউন: সাধারণ জ্ঞানের কথাই যখন বলছেন তাহলে কিউবা মিচেলের প্রসঙ্গে আসি। সে তো জাতীয় দলে ১০ মিনিট খেলেছিল। অনু্র্ধ-২৩ দলেও খেলেছে। তাকে তার টাকা খরচ করে কেন ট্রায়াল দিতে হবে। মাত্র তো ৭-৮ মাস আগের কথা।
ডুলি: আগেই বলেছি তাকে আমি দেখিনি। সে অষ্টম টায়ারে খেলছে। আগেই কিন্ত এর ব্যাখ্যা দিয়েছি। এছাড়া জাতীয় দলে একসময় ১০ মিনিট খেললেই কি তাকে সরাসরি নতুন করে দলে নেওয়ার সুযোগ আছে? সে নিজের টিকিটে এসে ট্রায়াল দিয়ে নতুন করে সুযোগ করে নিলে পরবর্তীকালে তো সেই অর্থ পেয়ে যাবেই।
দেখুন, বিষয় খুবই সহজ!
যদি কোনও খেলোয়াড় উচ্চ পেশাদার পর্যায়ে খেলে এবং আমরা দেখতে পাই সে আর্সেনাল, লিভারপুল বা ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে খেলছে— তবে আমরা সবাই একমত যে সেই খেলোয়াড়ের কোনও ট্রায়ালের প্রয়োজন নেই।
আপনাদের ইতিবাচক দিক নিয়ে ফোকাস করা উচিত।
বাংলা ট্রিবিউন: সেটা কেমন? জাতীয় দলের অনুশীলনে বাস, জার্সি ও আইস বাথসহ অন্য সমস্যা থাকলে সেটা মিডিয়া তুলে ধরবে না?
ডুলি: আপনি কোন জিনিসটাকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন, তার ওপর নির্ভর করে। কিছু মানুষ মনে করে সকালে নাস্তায় কফি না পাওয়াটাই একটা বড় সমস্যা, আবার কিছু মানুষ মনে করে কফি না থাকলেও সমস্যা নেই, চা খাই বা কিছুই না খাই।
কিছু মানুষ মনে করে আইস বাথ না পাওয়া অনেক বড় সমস্যা। আবার অনেকে মনে করে ঠিক আছে, ট্রাক নষ্ট হওয়া বা দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহকারী কোম্পানি সময়মতো বরফ দিতে পারেনি। আমি এটাকে সমস্যা হিসেবে দেখি না, কারণ আমরা হোটেলেও বরফ যোগাড় করতে পারি অথবা বসুন্ধরা কিংসের জিমে গিয়ে সেখানকার বরফ ব্যবহার করতে পারি। সমস্যাটা কোথায়?
মানুষ যদি সবকিছুতে সমস্যা খুঁজতে চায়, তবে তারা খুঁজেই পাবে। আর যদি তারা দেখে যে কোনও একটা অসুবিধা হয়েছে এবং তা কীভাবে সমাধান করা যায়— তবে সেটাই আসল সফলতা।
তাই মূল প্রশ্ন হলো, আপনি জীবনকে কীভাবে সাজাতে চান— সবসময় সমস্যা খুঁজে নাকি সমাধান বের করে?
শুধু খেলোয়াড়দের নয়, প্রত্যেকের চিন্তা করার মানসিকতা বদলানো উচিত যে তাদের জীবনটা কেমন হওয়া উচিত। আমি খেলোয়াড়দের সবসময় বলি— তোমরা নিজেরাই তোমাদের জীবনের স্থপতি।
বাংলা ট্রিবিউন: আচ্ছা আপনি তো অনেক ব্যাখ্যা দিলেন। এই যে সপ্তাহখানেক হলো জাতীয় দলের অনুশীলন চলছে। এখনও কোনও মিডিয়া সেশন হলো না! লুকোচুরি চলছে। এমনটি কি বিশ্বে কোথায় আছে? কী বলবেন? এটা কি পেশাদার আচরণ?
ডুলি: আমার দিক থেকে সমস্যা নেই। কেন হচ্ছে না আমি জানি না।
বাংলা ট্রিবিউন: আচ্ছা পেশাদারত্ব নিয়ে একটু বলি। সবার মধ্যে সিরিয়াসনেসটা থাকা তো উচিত।
ডুলি: আমি ওদেরকে বলেছিলাম, আমাদের সামনে এসে ফুটবল সমর্থকদের সচেতন করা উচিত।
বাংলা ট্রিবিউন: বাফুফে কর্তাদেরও… পুরো সিস্টেমেরই…
ডুলি: আমি এখন রাতের খাবার খাচ্ছি… (এরপর ডুলির সঙ্গে আর কথা এগোয়নি)।









