নারী সংসদ সদস্যদের কটূক্তি, এমপি হামজার কী হবে?

উদিসা ইসলাম
০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৫৯আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৮

সম্প্রতি নারী সংসদ সদস্যদেরর বিরুদ্ধে জামায়াত দলীয় এমপি আমির হামজার করা কটূক্তির ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সেই আলোচনা সংসদেও গড়িয়েছে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিচার চেয়ে সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় প্রশ্ন উঠেছে—সংসদের বাইরের কোনও মর্যাদাহানিকর বক্তব্যের জন্য সংসদ কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে কিনা। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে পারা উচিত। কেননা, এ ধরনের পাবলিক অনুষ্ঠানে একজন সংসদ সদস্য অপর এক বা একাধিক সংসদ সদস্যের নামে কটূক্তি করলে—সেটা সংসদের মর্যাদাহানির কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী—সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সর্বোচ্চ এখতিয়ার জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সংসদীয় কমিটির। অসংসদীয়, মানহানিকর বক্তব্য বা শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য স্পিকার নোটিশের মাধ্যমে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা (যেমন- সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কার) নিতে পারেন। এছাড়া, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে ২ বছরের বেশি দণ্ড হলে সদস্যপদ শূন্য হতে পারে।

বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) সংসদ চলাকালে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘‘আজকে ডেইলি স্টার পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই সংসদে উপস্থিত আমি এবং আমার আরও একজন নারী সহকর্মীর বিরুদ্ধে এই সংসদে উপস্থিত আরেকজন (জামায়াত দলীয় সদস্য আমির হামজার প্রতি ইঙ্গিত করে) সংসদ সদস্য যে কদাকার, কুৎসিত ভাষায় ওয়াজ মাহফিল করেছেন, যে কুৎসিত ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। আমি আপনার (স্পিকার) কাছে এই ব্যাপারে বিচার চাইছি, সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’’ ‘‘সংবাদপত্রের রিপোর্টিং নিয়ে কোনও পয়েন্ট অব অর্ডার হয় না’’ উল্লেখ করে স্পিকার প্রথমে এই পয়েন্ট অব অর্ডারটি নিষ্পত্তি করেন।

পরে রুমিন ফারহানার উত্থাপিত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আমাদের সংসদীয় কমিটি গঠন হয়েছে। মাননীয় সংসদ সদস্যকে অনুরোধ করবো—তিনি যদি এ বিষয়ে নোটিশ দেন, নোটিশটি আপনার মাধ্যমে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হলে নিশ্চয়ই ভালো হবে। কোথাও আপনাদের অপদস্থ হওয়ার মতো পরিস্থিতি হলে স্পিকারের মাধ্যমে নোটিশ দিতে পারেন। তাহলে তার যথাযথ প্রতিকার হবে।’’

নিয়মানুযায়ী, সংসদের ভেতরে কোনও সদস্য মানহানিকর বা অরুচিকর বক্তব্য দিলে স্পিকার নোটিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারেন। স্পিকারের মাধ্যমে সংসদীয় কমিটি তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

সংসদ সদস্যের সংসদে বলা কোনও কথা বা দেওয়া ভোটের বিষয়ে কোনও আদালতে মামলা বা ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, তবে তা সংসদের প্রাধিকার ভঙ্গের আওতায় পড়বে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বা বিশেষ কমিটি কোনও সদস্যের অনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্ত করে ব্যবস্থার সুপারিশ করতে পারে। সংবিধানের ৭৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘‘সংসদে প্রদত্ত কোনও বক্তব্য বা ভোটের জন্য সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনও আদালতে ফৌজদারি বা দেওয়ানি কার্যধারা নেওয়া যায় না।’’

এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করে নারী অধিকার নেত্রী ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একজন সংসদ সদস্য জনগণের প্রতিনিধি। কিন্তু যে জনগণের ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তারা অশ্লীল ও অভদ্র না। এই আচরণ দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। তিনি যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সেই দলের উচিত তাকে যথাযথ জবাবদিহির অধীনে আনা। পার্টির উচিত, সব সদস্যকে শেখানো—সংসদ ও সংসদের বাইরে আচরণ কীভাবে করতে হবে, কথা কী বলতে হবে। সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকাটা অন্যায়। আইন প্রণেতারা যদি এরকম হয়, এদের কাছে কী আশা করবো।’’

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, ‘‘যদি সংসদের মর্যাদারহানি হয়, কেবল নিরপেক্ষ পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট হিসেবে কোনও বক্তব্য দেখার সুযোগ না থাকে, তবে সংসদ ব্যবস্থা নিতে পারার কথা।’’ সুজনের পক্ষ থেকে বারবার আচরণবিধি, আইনের কথা বলা হলেও সেটা এখনও হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘সংসদ সদস্যরা যাতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেরা লাভবান না হন, কোনও রকম অন্যায় কাজে যুক্ত না হন, সেজন্য আচরণবিধি দরকার। পাশের দেশে সংসদ সদস্যকে বহিষ্কারের উদাহরণও আছে।’’

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংসদের ভেতরে ও বাইরে যেকোনও বিষয়ে নিজেরা কোনও বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে সংসদে অভিযোগ আনতে পারেন। সংসদ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এক্ষেত্রে আমির হামজা আসলে কী বলেছেন, সেটি নিয়ে আগে তদন্ত হবে। আর ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নোটিশ প্রদান করলে, তদন্ত অনুযায়ী স্পিকার ব্যবস্থা নেবেন। তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার দুই-একটি মন্তব্যের বিষয়ে আমরা অবগত। ইতোমধ্যে তাকে কথা বলতে আরও সচেতন এবং সতর্ক হওয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’’ এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
আমির হামজার পরিবারের ওপর হামলার নিন্দা জামায়াতের
এবার রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হেফাজতের
আমার স্ত্রীকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে: আমির হামজা
সর্বশেষ খবর
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
আসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
শিশু রামিসা হত্যা মামলাআসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী