ভয়কে জয় করার প্রত্যয় আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার আহ্বানে সারা দেশে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। গান, কবিতা আর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় মুখরিত ছিল রাজধানীসহ সারা দেশ। এবারের বর্ষবরণে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মসূচি এবং সরকারের নতুন উপহার ‘কৃষক কার্ড’ উৎসবকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
ছায়ানটের প্রভাতি: ‘ভয়কে জয় করার প্রত্যয়’
ভোর সোয়া ৬টায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতির মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’— এই প্রতিপাদ্যে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় পরিবেশনা। মোট ২২টি গান ও কবিতার মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় জাতীয় কবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লোকজ সাধকদের। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ ও মুক্তিযোদ্ধা মতলুব আলীর প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো হয়।
সমাপনী বক্তব্যে ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, “পয়লা বৈশাখ বাঙালির জাতিসত্তা উন্মোচনের দিন। সংস্কৃতির সব প্রকাশ যেন নির্বিঘ্ন হয়।”
বৈশাখী শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিন ও মানবিকতার প্রতিফলন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল আলম ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে চারুকলা থেকে বের করা হয় বর্ণাঢ্য ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। শোভাযাত্রায় দেশীয় লোকজ মোটিফের পাশাপাশি নজর কেড়েছে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লেখা প্ল্যাকার্ড।
এছাড়া ‘বাঁচাও সুন্দরবন’, ‘ইরানে মার্কিন যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘গণহত্যাকারীদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করো’, ‘ফসলের লাভজনক মূল্য দাও’, ‘শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ কর’, ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করো’— এমন স্লোগানে সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।
কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহার ‘কৃষক কার্ড’
নতুন বছরের প্রথম দিনে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রাথমিক পর্যায়ে ১১টি কৃষি ব্লকের ২০ হাজার ৬৭১ জন ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষক এই কার্ডের মাধ্যমে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবেন। প্রধানমন্ত্রী একে কৃষকদের জন্য নববর্ষের উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি
এবারের নববর্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমবারের মতো দলীয় শীর্ষ নেতার নেতৃত্বে বৈশাখী শোভাযাত্রা করেছে জামায়াতে ইসলামী। দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদের ব্যানারে প্রেস ক্লাব থেকে রমনা পর্যন্ত এই র্যালিতে নেতৃত্ব দেন সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
অপরদিকে বাংলামোটর থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের ‘নাগরিক বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠানে বাউল গান ও বায়োস্কোপের আয়োজন ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের শোভাযাত্রায় শরীফ ওসমান হাদির খুনিদের বিচার দাবি করে সাধারণ মানুষের মাঝে মুড়ি-বাতাসা বিতরণ করা হয়।
বিনোদন কেন্দ্রে জনতার ঢল
বিকালের পর থেকেই রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নামে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চিড়িয়াখানা, লালবাগ কেল্লা এবং হাতিরঝিল ছিল উৎসবমুখর। কেউ মেলায় মেতেছেন কেনাকাটায়, কেউবা মেতেছিলেন সেলফি আর আড্ডায়। অনেক জায়গায় পান্তা-ইলিশের প্রথাগত ভোজনের পাশাপাশি যুদ্ধবিরোধী গান ও কবিতার আসরও বসেছিল।
সব মিলিয়ে এবারের পহেলা বৈশাখ পরিণত হয়েছিল এক বিশাল প্রাণের মেলবন্ধনে, যেখানে সংস্কৃতির টানে এক হয়েছিলেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।









