সবুজ অর্থনীতিতে উৎসাহ, বাজেটে আসছে একগুচ্ছ প্রণোদনা 

গোলাম মওলা
১০ জুন ২০২৬, ২০:০০আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ২০:৫৩

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতে বড় ধরনের কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ব্যাটারি শিল্প এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তারে একগুচ্ছ কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর আয়কর শূন্য শতাংশ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। পাশাপাশি যেসব গ্রাহক সৌরশক্তি ব্যবহার করবেন, তাদের বিদ্যুৎ বিলে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরশীল থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থির হওয়ায় বিকল্প ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।

ব্যাটারি শিল্পে ২০৩০ সাল পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা

প্রস্তাবিত বাজেটে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কর মওকুফের প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর মোট করের বোঝা প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে স্থানীয়ভাবে ব্যাটারি উৎপাদন কিংবা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কর ছাড় কার্যকর হলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের খরচ কমবে এবং স্থানীয় ব্যাটারি শিল্পও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছরে শুল্ক সুবিধার বড় একটি অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখার চিন্তা করছে সরকার। এর মাধ্যমে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেরও চেষ্টা থাকবে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে

সবুজ পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও নবায়নের সময় আরোপিত অগ্রিম আয়করও বড় পরিসরে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সব ধরনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী গাড়ির ক্ষমতা অনুযায়ী এই কর ২৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতে পারে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী— ২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতার ইভি: ২৫ হাজার টাকা, ৩০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত: ৫০ হাজার টাকা, ৪০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত: ৭৫ হাজার টাকা, ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি: ১ লাখ টাকা। এতে বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি ও ব্যবহার ব্যয় কমবে এবং নতুন ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্থানীয় শিল্পেও সুবিধা

শুধু গাড়ি আমদানিকারকদের জন্য নয়, স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী, সংযোজনকারী ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কর সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। একইসঙ্গে ই-বাইক ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ইভি ব্যবহারের অন্যতম বড় বাধা হলো পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামোর অভাব। তাই চার্জিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে কর সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চার্জিং স্টেশন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

ইলেকট্রিক স্কুটার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রানার মোটরসের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ফিরোজ কবির বলেন, ‘‘বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পরিবহনের দিকে ঝোঁক বাড়ছে এবং বাংলাদেশও সেই প্রবণতার বাইরে নয়।’’

তবে তিনি মনে করেন, কর সুবিধার পাশাপাশি চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যবহারকারী বাসায় চার্জ দিয়ে গাড়ি চালান। কিন্তু বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সারা দেশে নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত চার্জিং স্টেশন গড়ে তুলতে হবে। তার মতে, ইভির প্রাথমিক মূল্য তুলনামূলক বেশি হলেও পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় ধীরে ধীরে ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে।

কর বৈষম্য দূর করার দাবি

পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন খান মনে করেন, শুধু কর ছাড় দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। এর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক পরিবহন খাতে সামগ্রিক নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে যেখানে শূন্য বা ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়, সেখানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ওপর ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হয়। এটি এক ধরনের কর বৈষম্য।’’

তার ভাষ্য, জ্বালানির ওপর কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরবরাহ শৃঙ্খল নয়, বরং প্রকৃত ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সিপিডিরও একই ধরনের সুপারিশ

সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য একগুচ্ছ কর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, এই করের কারণে মোট করভার ২৮ থেকে ৩১ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

এ ছাড়া সিপিডি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে সংস্থাটি ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাতিল এবং আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার পক্ষে মত দিয়েছে।

জলবায়ু অর্থায়ন ও সবুজ অর্থনীতির পথে নতুন বার্তা

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বাজেটে ঘোষিত এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকেই এগিয়ে নেবে না, বরং বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সবুজ শিল্পায়নের পথও সুগম করবে। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, কর ছাড়ই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, সহজ অর্থায়ন, নিরবচ্ছিন্ন নেট-মিটারিং সুবিধা, চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, প্রস্তাবিত কর সুবিধার পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। সেই বাজেটে যদি এসব প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও পরিবহন খাতে একটি নতুন সবুজ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
ঋণের শর্তে বরবাদ হতে চলেছে শিল্পে প্রণোদনা
বাজেটের ব্রিফকেস: দুই শতকের ঐতিহ্যের পেছনের গল্প
বাজেট ২০২৬-২৭ ঘোষণা কালকী বার্তা আসছে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে 
সর্বশেষ খবর
আচরণবিধি ভাঙায় রানার শাস্তি
আচরণবিধি ভাঙায় রানার শাস্তি
প্রবাসীদের সুরক্ষায় সংসদীয় কমিটি গঠনের আহ্বান হান্নান মাসউদের
প্রবাসীদের সুরক্ষায় সংসদীয় কমিটি গঠনের আহ্বান হান্নান মাসউদের
ঋণের শর্তে বরবাদ হতে চলেছে শিল্পে প্রণোদনা
ঋণের শর্তে বরবাদ হতে চলেছে শিল্পে প্রণোদনা
এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নতুন শ্রমবাজার খুঁজছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী
এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নতুন শ্রমবাজার খুঁজছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার