বন্ধ হয়ে যাওয়া বা আংশিক সচল শিল্পকারখানাকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার পুনর্বাসন তহবিল এখন শিল্প খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবন প্যাকেজ’-এর অংশ হিসেবে গঠিত এই বিশেষ তহবিলকে ঘিরে উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা ছিল বড় ধরনের স্বস্তির। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বস্তির জায়গায় এখন তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ— কারণ নীতিমালার কঠোর ঋণ শর্ত।
শিল্পমালিক ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজটি কার্যত “ঋণের শর্তে বরবাদ হতে চলেছে শিল্পে প্রণোদনা” হিসেবে রূপ নিচ্ছে। কারণ, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে এই উদ্যোগ, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই নীতিগত শর্ত পূরণ করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কঠোর শর্তে শুরুতেই অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, বন্ধ বা আংশিক সচল বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারিত হলেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি কঠোর শর্ত— বিশেষ করে ‘ক্লিন সিআইবি রিপোর্ট’, নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ পরিশোধ কাঠামো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার বা ঋণ জালিয়াতির কোনও রেকর্ড থাকলে কোনও প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাবে না। একইসঙ্গে ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ একবছর নির্ধারণ করায় বাস্তব বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি কারখানার পক্ষে “ক্লিন সিআইবি” বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব। কারণ উৎপাদন বন্ধ থাকলে নগদ প্রবাহ থাকে না, ফলে পূর্বের ঋণও শ্রেণিকৃত হয়ে যায়। সেই অবস্থায় নতুন করে শর্ত পূরণ করা প্রায় অবাস্তব।
‘যাকে বাঁচাতে চাই, তাকেই বাদ দিচ্ছে শর্ত’
শিল্প উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশের মতে, প্রণোদনা প্যাকেজের মূল লক্ষ্যই হলো— সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করা। কিন্তু বাস্তবে শর্তগুলো সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, ক্লিন সিআইবি শর্তের কারণে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। তার মতে, যে প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে বন্ধ হয়েছে, তার কাছে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য নমনীয় নীতি, কিস্তি পুনঃতফসিল বা সুদ হ্রাসই বেশি কার্যকর হতে পারত।
ছোট ও মাঝারি শিল্প নিয়ে শঙ্কা
উদ্যোক্তারা আরও বলছেন, কাগজে-কলমে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সুবিধা বড় শিল্পগোষ্ঠীর দিকেই ঝুঁকে যেতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রণোদনা ও রফতানি সহায়তার বড় অংশও বড় প্রতিষ্ঠানের দখলে গেছে, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময়ই পিছিয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘ক্লিন সিআইবি রিপোর্টের শর্ত বহাল থাকলে প্রকৃত সংকটে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা প্রয়োজন।’’
ফলে নতুন এই তহবিলও যদি কঠোর শর্তের কারণে সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই ঘুরপাক খায়, তাহলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একবছরের ঋণ মেয়াদেও প্রশ্ন
নীতিমালার আরেকটি বড় বিতর্কের জায়গা হলো ঋণের মেয়াদ। সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি বাস্তবসম্মত নয়।
কারণ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি কারখানা পুনরায় চালু করা, বাজারে ফিরে যাওয়া এবং নগদ প্রবাহ তৈরি করতে স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগে। এমন পরিস্থিতিতে এক বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের চাপ অনেক প্রতিষ্ঠানকে আবারও সংকটে ফেলতে পারে।
উদ্যোক্তাদের একটি অংশের বড় আপত্তি ঋণের মেয়াদ নিয়ে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিটি ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর হবে। প্রয়োজন হলে তা নবায়ন করা যাবে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের যুক্তি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি কারখানা চালু করে উৎপাদন শুরু, ক্রেতা সংগ্রহ এবং বাজারে অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সময় লাগে। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র এক বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের চাপ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য অবাস্তব হয়ে উঠতে পারে।
মহিউদ্দিন রুবেল উল্লেখ করেন, কোনও প্রতিষ্ঠান যদি এক বছরের মধ্যেই পুরো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা রাখে, তাহলে তার বিশেষ প্রণোদনা ঋণের প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
‘শর্ত নয়, প্রয়োজন বাস্তব মূল্যায়ন’
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি একক মানদণ্ড দিয়ে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিচার করা ঠিক হবে না। বরং প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা মূল্যায়ন কাঠামো থাকা উচিত।
তাদের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠান সামান্য আর্থিক সহায়তায়ই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম, কিছু প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন দরকার, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান হয়তো আর পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়। এই তিন শ্রেণির জন্য ভিন্ন নীতি গ্রহণ না করলে তহবিলের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যাবে।
একজন ব্যাংক নির্বাহীও স্বীকার করেন, ক্লিন সিআইবি শর্ত বাস্তবতায় অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিতে পারে। তার মতে, প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, বাজার সম্ভাবনা এবং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া হলে তহবিল বেশি কার্যকর হতো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে একাধিকবার ফোন করে এবং তার হোয়াটঅ্যাপ নম্বরে এসএমএস দিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও সহকারী মুখপাত্রের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
নীতির লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ নীতিগতভাবে ইতিবাচক এবং অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরানোর সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু বাস্তবায়ন কাঠামো যদি নমনীয় না হয়, তাহলে এটি উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
একদিকে খেলাপি, জালিয়াত ও অনিয়মকারীদের বাইরে রাখা জরুরি, অন্যদিকে প্রকৃত সংকটে থাকা শিল্পগুলোকে কঠোর শর্তের কারণে বাদ দিলে পুরো উদ্যোগই আংশিক সফলতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই— ‘ঋণের শর্তে বরবাদ হতে চলেছে শিল্পে প্রণোদনা’— এই আশঙ্কা কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি নীতিমালায় শর্ত শিথিল করে শিল্প পুনরুজ্জীবনের পথ খুলবে বাংলাদেশ ব্যাংক?









