জাতীয় বাজেট: রাজস্ব সংকট সামলে প্রবৃদ্ধির পথে চলার প্রত্যয়

গোলাম মওলা
১১ জুন ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩

রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার বাস্তবতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে ব্যয় সংকোচন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার দ্বিমুখী কৌশল দেখা যাচ্ছে। একদিকে সরকার ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনতে চাইছে, অন্যদিকে রফতানি, রেমিট্যান্স ও উৎপাদনমুখী শিল্পকে উৎসাহ দিতে বাড়ানো হচ্ছে প্রণোদনা ও সুরক্ষা সুবিধা।

একইসঙ্গে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ পুনর্বহালের উদ্যোগ, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা এবং তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপও থাকছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

ভর্তুকি কমানোর পথে সরকার

আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ কমিয়ে প্রায় ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার ৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত ভর্তুকি ব্যয় ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা কম ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য ধীরে ধীরে সমন্বয়ের কারণে ভর্তুকির চাপ কমবে বলে সরকার আশা করছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে এই হিসাব বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

রফতানি ও রেমিট্যান্সে বাড়ছে প্রণোদনা

ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসগুলোকে শক্তিশালী করতে চায় সরকার। আগামী অর্থবছরে রফতানি, পাট ও রেমিট্যান্স খাতে মোট প্রণোদনা বরাদ্দ প্রায় ১৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা হতে পারে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বেশি।

সরকারের ধারণা, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতিতে তারল্য সংকট কিছুটা কাটবে।

শিল্প সুরক্ষায় শুল্কের ঢাল

প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানি শুল্ক ও কর কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন। স্থানীয় উৎপাদকদের রক্ষায় জিপসাম বোর্ড, পিভিসি রেজিন, পিইটি রেজিন, ট্রান্সফরমার, ওয়াশিং মেশিন, সাইকেলের যন্ত্রাংশ, কাগজ, কপার ও স্টিলজাতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্লোট গ্লাস, ডিটারজেন্ট শিল্পের কাঁচামাল, কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ উপকরণ এবং রিফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানোর এই দ্বৈত নীতি দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

আবারও ফিরছে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ

প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ।

সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচায় প্রকৃত লেনদেন মূল্য এবং দলিল মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেই অতিরিক্ত অর্থ ঘোষণা করা যাবে। এর জন্য নিয়মিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। বিনিময়ে ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সংস্থা প্রশ্ন তুলবে না। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

রিহ্যাবসহ আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণ কর হারে কর আদায় করলে কেউ এই সুযোগ নিতে আগ্রহী হবে না। অন্যদিকে কর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কার্যত অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং সৎ করদাতাদের প্রতি বৈষম্য তৈরি করবে।

নতুন পে-স্কেল, কিন্তু আলাদা বরাদ্দ নেই

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও এ জন্য বাজেটে আলাদা কোনো বরাদ্দ রাখা হচ্ছে না। বেতন-ভাতা খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বেশি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল চালু হলে প্রয়োজনীয় অর্থ থোক বরাদ্দ ও অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের জন্য সংরক্ষিত তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে। বাজেটে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সিগারেটের দাম বাড়ছে, নতুন করে করের আওতায় নিকোটিন পাউচ

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে সব ধরনের সিগারেটের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম নিম্নস্তরে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে।

একইসঙ্গে প্রথমবারের মতো নিকোটিন পাউচকে কর কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের মূল্য ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। তবে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, কর আরোপের মাধ্যমে পণ্যটিকে কার্যত বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

বাজেটের মূলবার্তা কী

সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার সরাসরি ভর্তুকিনির্ভর ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন, রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে। একইসঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, শিল্প সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা রয়েছে।

তবে ভর্তুকি কমানো, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ এবং উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা— এসব পদক্ষেপ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেট মূলত ব্যয় সংকোচন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা। সেই ভারসাম্য কতটা ধরে রাখা যায়, সেটিই হবে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
ব্যাংকে টাকা রেখেও লাভ নেই, মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলছে আমানতকারীর মুনাফা 
ঋণ চাইছে বাংলাদেশ, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে কীভাবে?
‘অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে হিন্দুরা এখন বেশি সুখে-শান্তিতে আছেন’
সর্বশেষ খবর
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের অস্ত্র সেই ‘ইসলামবিদ্বেষ’
কী, কেন, কীভাবে নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের অস্ত্র সেই ‘ইসলামবিদ্বেষ’
‘ফুটবলাররা কেউ রোবট নয় যে প্রোগ্রাম সেট করলাম আর খেলে ফেললো’
‘ফুটবলাররা কেউ রোবট নয় যে প্রোগ্রাম সেট করলাম আর খেলে ফেললো’
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে, বিকল্প নেই’
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে, বিকল্প নেই’
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
জামায়াত এমপির হোটেল-রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করলো প্রশাসন, কারণ কী?
জামায়াত এমপির হোটেল-রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করলো প্রশাসন, কারণ কী?
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
নেশার কারণে গান ছাড়িনি: আনুশেহ আনাদিল
নেশার কারণে গান ছাড়িনি: আনুশেহ আনাদিল