জাতীয় সংসদ মানেই কি কেবল আইন প্রণয়নের গুরুগম্ভীর বিতর্ক আর রাজনৈতিক উত্তাপ? মাঝেমধ্যে এই চেনা আবহের বাইরেও সংসদ কক্ষ হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত নাট্যমঞ্চ, যেখানে নিছক রসিকতা বা মুখ ফসকে যাওয়া শব্দ মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব গাম্ভীর্য।
বুধবারের (১০ জুন) সংসদ অধিবেশন সাক্ষী হলো তেমনই এক বিরল ও আমুদে বিকালের। ধর্মমন্ত্রীর পক্ষে প্রশ্নের উত্তর দিতে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরল স্বীকারোক্তি— ‘আমি সওয়াবের ওয়াস্তে উঠছি’, কিংবা নিজেকে ‘খুব একটা গরিব মানুষ না’ দাবি করে নিজের চার গাড়ির খতিয়ান দেওয়া, আর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মুখ ফসকে হাসপাতালের ‘যন্ত্রপাতি’কে ‘অস্ত্র’ বানিয়ে ফেলা— সব মিলিয়ে আইনপ্রণেতাদের হাসির রোলে বদলে যায় সংসদের চেনা সুর।
তবে বিনোদনের ষোলোকলা পূর্ণ হয় নাটোরের গ্যাস-সংযোগের দাবি যখন গড়ায় ‘শালা-দুলাভাইয়ের’ সম্পর্কের রসায়নে। নাটোরের জামাই বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর কাছে ‘শ্বশুরবাড়ির আবদার’ আর নোয়াখালীতে গ্যাসের জন্য মন্ত্রীকে আরও একটি বিয়ের পরামর্শে সংসদ কক্ষ রূপ নেয় হাসির অরণ্যে। রাজনীতির চড়া রোদের মাঝে এক চিলতে মেঘের মতো বুধবারের পুরোটা সময় জুড়েই স্পিকার থেকে শুরু করে সংসদ সদস্যরা বুঁদ হয়ে রইলেন এক নিখাদ ও হালকা চালের হাস্যরসে।
আমি সওয়াবের ওয়াস্তে উঠছি
জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, যা আনুষ্ঠানিক আলোচনার গাম্ভীর্যের মাঝেও এনে দেয় স্বস্তির হাসি। বুধবারের অধিবেশনেও তেমনই একটি দৃশ্যের জন্ম দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
ধর্মমন্ত্রীর পক্ষে একটি প্রশ্নের জবাব দিতে স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক নিয়মে বক্তব্য শুরু করতে গিয়ে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আপনাকে ধন্যবাদ।’
কিন্তু কথাটি শেষ হতেই সংসদকক্ষে শুরু হয় হাসির রোল। বিভিন্ন আসন থেকে শোনা যায় হাসির শব্দ। কেউ কেউ টেবিল চাপড়ে প্রতিক্রিয়া জানান। মুহূর্তেই পরিবেশ বদলে যায়।
প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হলেও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও হাসিতে যোগ দেন। কয়েক সেকেন্ড ধরে চলা সেই হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতি থামার অপেক্ষা করেন তিনি।
হাসাহাসি কিছুটা থামলে মুচকি হেসে বলেন, ‘না, এরকম অ্যাপ্রিসিয়েশন মাঝেমধ্যে করলে ভালো হয়।’
তার এই মন্তব্যে আবারও সংসদকক্ষে হাসির ঢেউ ওঠে।
এরপর একটু থেমে আরও একটি রসিক মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি সওয়াবের ওয়াস্তে উঠছি। অসুবিধা নাই।’
সংক্ষিপ্ত এই মন্তব্যে আবারও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সংসদকক্ষ। কয়েক মুহূর্তের জন্য গুরুগম্ভীর আলোচনার আবহ ছেড়ে সংসদ সদস্যরা উপভোগ করেন হালকা এক হাস্যরসের পর্ব।
আমি খুব একটা গরিব মানুষ না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জাতীয় সংসদে কখনও কখনও বিতর্কের জবাবও হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বুধবার সংসদ অধিবেশনে এমনই এক মুহূর্ত তৈরি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের এক বক্তব্যে জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান সাহেব বলেছেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক ব্যক্তির গাড়িতে চড়ে সংবর্ধনা নিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনও ব্যক্তির গাড়িতে চড়ে সংবর্ধনা নেয়নি।’
এরপর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও টেনে আনেন।
সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ছিলাম না, তখন আমি সালাহ উদ্দিন, আমাদের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলাম। বিদেশ থেকে যখন এসেছি, আমি আমার গাড়িতে করে সংবর্ধনা নিয়েছি। আমার চারটি গাড়ি আছে, আমার চারজন ড্রাইভার আছে, খুব একটা গরিব মানুষ না।’
তার এই মন্তব্যে সংসদকক্ষে তাৎক্ষণিক সাড়া পড়ে।
এরপর কক্সবাজারের একটি ঘটনার বর্ণনা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সেখানে তাঁর সফরের সময় লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ হয়েছিল। অনেক মাইক্রোবাস ও জিপের মধ্যে কোনটিতে উঠবেন, তা নিয়ে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
শালা-দুলাভাই নিয়ে হাস্যরস
গ্যাস-সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা শেষ পর্যন্ত সংসদে বিরল এক হাস্যরসের মুহূর্ত তৈরি করে। যেখানে নাটোরের গ্যাসের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ‘নাটোরের জামাই’, ‘শ্বশুরবাড়ির আবদার’ আর ‘নোয়াখালীতে আরেক বিয়ে’র প্রসঙ্গ।
বুধবার কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে নাটোরে শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে গ্যাস-সংযোগের বিষয়টি উত্থাপন করেন নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার।
জবাব দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ শুরুতেই সংসদে কিছুটা হালকা আবহ তৈরি করেন। তিনি নিজের পরিচয় দেন ‘নাটোরের জামাই’ হিসেবে।
মন্ত্রী বলেন, রাজনীতিবিদদের সবারই কোনও না কোনও জায়গায় শ্বশুরবাড়ি থাকে। সিলেটে গেলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলে সিলেটের দামান, আর নাটোরে গেলে বলা হয় নাটোরের জামাই।
রসিকতার আড়ালে তিনি গ্যাস খাতের অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতিও তুলে ধরেন। এরপর আবার ফিরে আসেন নাটোর প্রসঙ্গে। ‘নাটোর আমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে তো গ্যাস দিতেই হবে’, বলে সংসদে হাসির আবহ তৈরি করেন তিনি। সঙ্গে বলেন, দেশে নতুন গ্যাস পাওয়া গেলে এবং প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে নাটোরেও গ্যাস পৌঁছাবে।
মন্ত্রীর জবাবের পর স্পিকার রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে বলেন, আপনি মন্ত্রীকে একটা সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করতে পারেন। এমন প্রশ্ন করবেন না যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী কেন নাটোরে বিয়ে করেন নাই?
সম্পূরক প্রশ্নে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার নাটোরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে গ্যাস-সংযোগের বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে চান। এ সময় তিনি মন্ত্রীকে ‘দুলাভাই’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জবাবে মন্ত্রী মজা করে বলেন, ‘এটা তো শ্বশুরবাড়ির আবদার হয়ে গেলো।’
কিন্তু আলোচনার সবচেয়ে মজার মুহূর্তটি আসে পরে। নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এম মাহবুব উদ্দিন খোকন দাঁড়িয়ে রসিকতা করে বলেন, মন্ত্রী যদি নাটোরে শ্বশুরবাড়ির কারণে গ্যাস দেওয়ার কথা বলেন, তাহলে নোয়াখালীতেও যেন একটি বিয়ে করেন। তাহলে নোয়াখালীবাসীও গ্যাস পাওয়ার আশা করতে পারে।
খোকনের এই মন্তব্যে সংসদকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়। পরিস্থিতি আরও জমে ওঠে যখন স্পিকার সরাসরি জ্বালানিমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কি বিয়ে করতে চান?’
উত্তরে মন্ত্রীও রসিকতার সুর বজায় রাখেন। বিরোধী দলের সদস্যদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমার সামনে ওনারা বসে আছেন। ওনারা শরিয়াহ আইন ভালো বোঝেন। তিনটা বাকি আছে আমার এখনও। কিন্তু আমার শখ নাই আর বেশি করার। যেটা করছি সেটা যথেষ্ট।’
‘অস্ত্র না, আমি বলেছি যন্ত্রপাতি’
জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা চলছিল। নতুন হাসপাতাল, জনবল, আইসিইউ ও চিকিৎসাসেবার অবকাঠামো নিয়ে তথ্য তুলে ধরছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু বক্তব্যের মাঝখানে একটি শব্দের ভুল উচ্চারণই তৈরি করলো ভিন্ন এক দৃশ্য।
সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলছিলেন মন্ত্রী। হাসপাতালের পাশাপাশি জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি। এমন সময় তিনি বলেন, ‘শুধু হাসপাতাল না, সঙ্গে জনবল, অস্ত্র... মানে যন্ত্রপাতি, আইসিইউ এবং পোস্ট অপারেটিভ সেন্টার।’
‘অস্ত্র’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়। বিভিন্ন আসন থেকে শোনা যায় হাসির শব্দ। নিজের ভুলটি টের পেতেই মন্ত্রীও দ্রুত সংশোধন করে বলেন, ‘স্যরি, মানে মাননীয় স্পিকার স্যার সাহেব, স্যরি। অস্ত্র না, আমি বলেছি যন্ত্রপাতি।’
তার এই আত্মসংশোধনেও হাসির আবহ আরও কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়।









