অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর বাজেট, নাকি রাজনৈতিক প্রত্যাশার রূপরেখা?

গোলাম মওলা
১২ জুন ২০২৬, ০৯:৫৯আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৯:৫৯

দীর্ঘ অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ব্যাংক খাতের সংকটের মধ্যে দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেটের মূল প্রতিশ্রুতি—অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরিয়ে আনা।

বাজেট বক্তৃতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি ছিল ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার’। অর্থমন্ত্রী বারবার বলেছেন, অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার একটি নতুন পথরেখা তৈরি করতে চায়। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বাজেটে পুনরুদ্ধারের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার তুলনায় বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এখনও দুর্বল। ফলে এই বাজেট অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও নির্বাচনি অঙ্গীকারের প্রতিফলন বেশি কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।

পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশপাশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগের বছরও প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে ছিল।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এক বছরের ব্যবধানে প্রায় আড়াই শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী আর্থিক খাত। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নিলে সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।

এ কারণে অনেকেই বলছেন, বাজেটের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চেয়ে রাজনৈতিক আশাবাদের প্রতিফলন বেশি।

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হবে। বর্তমানে এই হার প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে ২ শতাংশের বেশি অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাস্তব চিত্র ভিন্ন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায় ৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর প্রশাসনে মৌলিক সংস্কার ছাড়া এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রায় অসম্ভব। ফলে বাজেটের আয়-ব্যয়ের হিসাবের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

বিশাল ঘাটতি, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা

প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সহজ ভাষায়, সরকার প্রতি ১০০ টাকা ব্যয় করবে, কিন্তু আয় করবে মাত্র ৭৪ টাকা। বাকি প্রায় ২৬ টাকা জোগাড় করতে হবে ঋণ নিয়ে।

এই ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সরকার বিদেশি উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার আশা করছে; যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ।

কিন্তু বিদেশি ঋণপ্রাপ্তি নির্ভর করবে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।

যদি প্রত্যাশিত বিদেশি ঋণ না আসে, তাহলে সরকারের সামনে একমাত্র বিকল্প হবে ব্যাংক খাত থেকে আরও বেশি ঋণ নেওয়া।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বেসরকারি খাতের ঋণ সংকোচন। সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পেতে সমস্যায় পড়বেন। এতে বিনিয়োগ কমবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে।

সুদের বোঝা বাড়ছেই

অর্থনীতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো ঋণের সুদ পরিশোধ। আগামী অর্থবছরে সরকারকে শুধু দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেট ব্যয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ চলে যাবে শুধু সুদ পরিশোধে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি এমন একটি ব্যয় যা উৎপাদনশীল নয়, কিন্তু রাষ্ট্রকে বহন করতেই হবে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা অবকাঠামো খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য কতটা বাস্তব?

বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়তে শুরু করেছে।

এই অবস্থায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তনও দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর কমানো বা কিছু পণ্যে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইনের দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং আর্থিক নীতির কার্যকর সমন্বয়।

ব্যবসা সহজ করার প্রতিশ্রুতি

বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে ডি-রেগুলেশন বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানোর উদ্যোগকে।

অর্থমন্ত্রী সরকারি সেবা সহজ করতে একটি টাস্কফোর্স গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য বিশেষ ওয়েবসাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন, লাইসেন্স, কর ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। সে কারণে এই ঘোষণা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া ব্যবসা সহজীকরণ সম্ভব নয়।

করছাড়ে স্বস্তি, কিন্তু প্রশ্নও আছে

এই বাজেটে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর।

একইসঙ্গে খাদ্যপণ্য, প্রযুক্তিপণ্য, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, কনটেন্ট নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে উল্লেখযোগ্য করসুবিধা দেওয়া হয়েছে।

সমালোচনার জায়গাও রয়েছে

রাজস্ব আহরণে এখনও পরোক্ষ কর ও ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা বেশি। সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব সরাসরি পড়ে। পাশাপাশি কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখার বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায্য বার্তা দেয়।

১০ অগ্রাধিকার ও পাঁচ বছরের স্বপ্ন

অর্থমন্ত্রী বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ এবং সুশাসন।

একইসঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করা এবং বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। তবে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা।

স্বপ্নের বাজেট, নাকি বাস্তবতার পরীক্ষা?

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং আয় কমে যাওয়ার চাপে সাধারণ মানুষ ক্লান্ত। তাদের কাছে বাজেটের আকার বড় বিষয় নয়; বড় বিষয় হলো জীবনের বাস্তব পরিবর্তন।

নতুন সরকার জনগণকে বড় স্বপ্ন দেখিয়েছে। অর্থমন্ত্রীও সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন বাজেটে। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাজেটে প্রত্যাশার ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে আস্থার জায়গায়। তাই আগামী এক বছর শুধু বাজেটের অঙ্ক নয়, বরং রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সংস্কারের অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে এই বাজেট ইতিহাসে সফলতার গল্প হয়ে থাকবে, নাকি আরেকটি উচ্চাভিলাষী ঘোষণাপত্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

 

/আরকে/
সম্পর্কিত
৭৮৬ কোটি থেকে লাখো কোটি: বাংলাদেশের বাজেটের রূপান্তর
জাতীয় বাজেট: রাজস্ব সংকট সামলে প্রবৃদ্ধির পথে চলার প্রত্যয়
ঋণের শর্তে বরবাদ হতে চলেছে শিল্পে প্রণোদনা
সর্বশেষ খবর
খুলনা সিটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ, মুমূর্ষু ৭ রোগীকে নেওয়া হলো আদ-দ্বীনে
খুলনা সিটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ, মুমূর্ষু ৭ রোগীকে নেওয়া হলো আদ-দ্বীনে
ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি ও মিথ্যা সংবাদে লাইক-কমেন্ট-শেয়ারে কবিরা গুনাহ
ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি ও মিথ্যা সংবাদে লাইক-কমেন্ট-শেয়ারে কবিরা গুনাহ
বিশ্বকাপের প্রথম দিনেই সম্প্রচার বিভ্রাটে ক্ষুব্ধ ভারতীয় দর্শকরা
বিশ্বকাপের প্রথম দিনেই সম্প্রচার বিভ্রাটে ক্ষুব্ধ ভারতীয় দর্শকরা
শিক্ষার্থীদের জন্য কোন ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক
শিক্ষার্থীদের জন্য কোন ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক
সর্বাধিক পঠিত
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল, কার কত বেতন
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল, কার কত বেতন
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
সীমান্তে আটকে থাকা বৃদ্ধের আছে আইডি কার্ড, চিনতে পেরেছে পরিবার
পেনশনের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুয়িটি পাবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা
পেনশনের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুয়িটি পাবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা
দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত
ভাইকে দেখে কাঁদতে শুরু করেন সেই বৃদ্ধ, ভারতে গেলেন কীভাবে
ভাইকে দেখে কাঁদতে শুরু করেন সেই বৃদ্ধ, ভারতে গেলেন কীভাবে