ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তবে স্থলপথে দেশে আসা তিনিই প্রথম ভারতীয় হাইকমিশনার নন। এর আগে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন সাবেক হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী। অবশ্য তখন করোনার কারণে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় স্থলপথে দেশে আসেন তিনি। দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকায় আগমনকে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবেই দেখছে কূটনীতিক মহল। বেনাপোল চেকপয়েন্টে নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ‘দুই দেশের গণতন্ত্র এক করার’ মন্তব্য নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা। প্রশ্ন হচ্ছে, বার্তাটি কি কূটনৈতিক ছিল নাকি রাজনৈতিক।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসের বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। কয়েক দশকের প্রথা ভেঙে ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তার পরিবর্তে রাজনীতিবিদকে নিয়োগ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম হয়। তিনি শুধু রাজনীতিবিদ নন, একজন সাবেক মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি’র আস্থাভাজন।
দীনেশ ত্রিবেদী জন্মসূত্রে বাঙালি না হলেও পশ্চিমবঙ্গে তার দীর্ঘ সময়ের রাজনীতির সুবাদে বাংলাভাষায় বেশ আয়ত্ত আছে। স্পষ্ট বাংলায় কথা বলতে পারেন তিনি। তবে এই প্রথম কোন বাংলাভাষী হাইকমিশনার তিনি নন। একে রাজনীতিবিদ তার সঙ্গে বাংলাভাষী; দুইয়ে মিলে তিনি দেশে কী বার্তা দিতে এসেছেন, তা নিয়ে এখন কূটনৈতিক মহলের আলোচনা।
দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশকে এক করার বক্তব্য আজ প্রথম দেননি। দেশে প্রবেশ করার আগে গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি কলকাতায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। আমাদের স্বপ্ন অভিন্ন। গণতন্ত্রের স্বপ্ন আমাদের সবার। তাই আমি শুধু ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কথা বলছি না; এর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ২০ কোটি মানুষকে যোগ করছি। এই ১৬০ কোটি মানুষ, যারা আমাদের ভাই-বোন ও মা—তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ।
আজ শুক্রবার (১২ জুন) বেনাপোল চেকপয়েন্টে তিনি বলেছেন, আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি অ্যাড করেছি, ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে, আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে আসছি। একই আকাশ একই বাতাস। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করবো। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
হাইকমিশনার হিসেবে নিজের অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের শক্তিশালী ডেমোক্রেসি, আমাদেরও শক্তিশালী ডেমোক্রেসি। দুই ডেমোক্রেসি মিলে গেলে একটা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়। একটা পুরো ইকোনমিক ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায় কিন্তু এই মেলামেশাটা দরকার। আর এর জন্য আমার যা দায়িত্ব আছে আমি নিশ্চয়ই পালন করব কিন্তু আপনার সাপোর্ট থাকা দরকার।
তিনি বলেন, আমাদের দুজনে মিলে শক্তি, একটা শক্তি হলে হবে না। দুজনে মিলে যা শক্তি হবে ওইটাই আসল শক্তি আর ওই শক্তিটা পুরো পৃথিবী যেন দেখে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুরাজনৈতিক কথা ভেবেই ভারত বিশেষভাবে দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় নিয়োগ দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি হওয়া কূটনৈতিক টানাপড়েনের খুব বেশি উন্নতি হয়নি। যার কারণে সীমান্তে পুশইনের মতো ঘটনা চলমান আছে। বিজিবি বিএসএফ’র মহাপরিচালক পর্যায়ে সম্মেলন থেকেও পুশইন নিয়ে স্পষ্ট কোন বার্তা আসেনি।
তবে নতুন হাই কমিশনার বলেছেন, ভারত-বাংলা একই আকাশ একই বাতাস একই যন্ত্র। যা দুই দেশের জন্য ভালো হয় সেই পদক্ষেপ নেব।
ঢাকার সাবেক একজন কূটনৈতিক বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকগুলো অমীমাংসিত বিষয় আছে। তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পুশইন। কৌশলগতভাবেই দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দিয়েছে ভারত। তার বার্তা স্পষ্ট, দুই দেশকে একসঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে। দুই দেশ এক করে ফেলার এখানে সুযোগ নেই, কারণ বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সফিউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীনেশ ত্রিবেদী একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং পেশাদার রাজনীতিবিদ। তার বক্তব্যের মধ্যে যেমন শুভেচ্ছা বার্তা আছে আবার বিশ্লেষণ করলে অন্যভাবেও দেখা যায়। তিনি বলেছেন ভারতের ১৪০ কোটি জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি জনগণ যদি এক হয়ে যায়, তাহলে একটা বড় মহাশক্তি হতে পারে। তবে বক্তব্যটা এখানেই বুঝে নিতে হবে যে, বাংলাদেশের ২০ কোটি লোক কিন্তু স্বাধীন জাতি। একটা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার জন্য বা একত্রিত হয়ে মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইছে তার নিজের শক্তি সে আত্মপ্রকাশ করবে, ভারত বা অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকবে এবং পরস্পর সহায়ক থাকবে, পরস্পরকে সাহায্য করবে। পরস্পর নির্ভরশীল এবং আত্মমর্যাদা রেখে সম্পর্ক ভালো থাকবে। এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চল গঠিত হবে। বাংলাদেশ আরো চায় শুধু বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশসহ সার্কের দেশগুলো সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক। যদি ভারতের সম্পর্ক ভালো হয় সবার সঙ্গে, তাহলে কিন্তু পুরা অঞ্চলটি একটা শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে দাড়িয়ে বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এখান বিশ্বে বিভিন্ন দেশে কিন্তু আঞ্চলিক জোটে যুক্ত হচ্ছে। সুতরাং এখানে শুধু বাংলাদেশ ভারত নয়, বাংলাদেশ ভারত লোক এক হয়ে গেলে যে শক্তিশালী রাষ্ট্র হবে সেটা তো আমরা চাই না, আমরা চাই দুই দেশ নিজ জায়গায় শক্তিশালী হবে অন্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো রেখেই। সার্কের অঞ্চলগুলো যদি একটা শক্তিশালী অঞ্চল হিসেবে পরিণত হয় বিশ্বের দরবারে, তাহলে তারা একটা স্থান দখল করে নিবে এবং সামষ্টিক সম্পর্কে একটা কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের যে দুটি বড় সমস্যা এখন আছে, একটা হচ্ছে পুশইন হচ্ছে। এটা বাংলাদেশের ভারত সম্পর্কের একটা খারাপ দিক। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত গঙ্গার পানি চুক্তি যেন সুন্দরভাবে হয় এবং লাভজনক হয় দুই দেশের জন্য, তৃতীয়ত তিস্তার চুক্তি ঝুলে আছে। নতুন হাইকমিশনারের সময় যদি এটা হয়, তাহলে আমরা বলতে পারবো যে উনি সফল হয়েছেন এবং তার মিশন সফল হয়েছে।








