জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের কঠোর তদারকি ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংসদ সদস্যরা। তারা বলেছেন, নজরদারির ঘাটতি থাকলে সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের অষ্টম বৈঠকে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন।
অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন।
সরকারি দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানালেও নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানান। অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বাজেটকে ইতিবাচক হলেও উচ্চাভিলাষী ও সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়াতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রায়হান শিরাজী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। তবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে ব্যর্থতা এ বাজেটকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তিনি তিস্তা প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ না থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন।
জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য আবুল কাওসার মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট যেন ‘লুটেরাদের পেটে না যায়’।
নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার সরকার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ বাড়তে পারে। রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বড় বাজেট ঘাটতি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে সুদের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস এবং সরকার ও করদাতাদের ওপর ঋণের চাপ বাড়াতে পারে।
বাজেট ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিশাল এ ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাবে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২১ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিএনপি-সমর্থিত সংরক্ষিত আসনের সদস্য ফাহমিদা হক বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এ বাজেট কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
সংরক্ষিত আসনের বিএনপি সদস্য মমতাজ আলো বলেন, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সুশাসন সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে মানুষকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এজেডএম রেজাউনুল হক বলেন, বাজেট করদাতাদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের বোঝা কমাতে করনীতির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংরক্ষিত আসনের সদস্য জেবা আমিনা খান বলেন, বিশাল এ বাজেটের অর্থ যেন কেবল জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নে সব সংসদ সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মুখতার আলী রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেন। তিনি মূল্যস্ফীতির চাপ, ঋণ পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতার বিষয়ে সতর্ক করে অধিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বাস্তবসম্মত আর্থিক পরিকল্পনার আহ্বান জানান।
সংরক্ষিত আসনের বিএনপি সদস্য রেবেকা সুলতানা বাজেটকে সময়োপযোগী ও উন্নয়নমুখী উল্লেখ করে সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি এবং রফতানি সম্প্রসারণে এর গুরুত্ব তুলে ধরেন।
খেলাফত মজলিশের সদস্য মো. আবুল হাসান তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্কুলে মিড-ডে মিল কর্মসূচি এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর অব্যাহতির উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তবে বাধ্যতামূলক টিআইএন সংক্রান্ত প্রস্তাবসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এমন পদক্ষেপের সমালোচনা করেন তিনি।
সংরক্ষিত আসনের বিএনপি সদস্য মনসুরা আক্তার বলেন, নারীর উন্নয়ন, মাতৃ ও শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রয়েছে। তিনি নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
তবে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নিপুন রায় চৌধুরী বাজেটকে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা অতিক্রম করে একটি কল্যাণমুখী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, সমালোচকরা বাজেট ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, তবে একটি ভাঙা অর্থনীতিকে পুনর্গঠনে কিছু ব্যয় অনিবার্য। বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বহুমাত্রিকতা।
নিপুন রায় চৌধুরী গঠনমূলক সমাধান নিয়ে বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।









