নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেলওয়ে সংযোগ সেতুর কয়েকটি পিলারের নিচ থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র মাটি কেটে ট্রাকে করে ইটভাটায় বিক্রি করছে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার মুখে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
যদিও পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্তৃপক্ষের দাবি, সেতু নির্মাণের সময় জলাধার ভরাট করে অস্থায়ীভাবে বালু ফেলে সড়ক তৈরি করা হয়েছিল। সেই মাটি সরিয়ে আগের জলাশয়ের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই কাজ করা হচ্ছিল। এতে সেতুর নিরাপত্তার কোনও ঝুঁকি নেই।
মাটি কাটার খবর পেয়ে ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। মঙ্গলবারও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘পদ্মা রেলসেতুর নিচ থেকে মাটি কাটার খবর পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুমতির কথা বললেও এমন কোনও নথি দেখাতে পারেননি। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সেখানে মাটি কাটা বন্ধ থাকবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’
এ ব্যাপারে পদ্মা রেলসেতু প্রকল্পের ব্রিজ অ্যান্ড ভায়াডাক্ট ইনচার্জ প্রকৌশলী আমিনুল করিম বলেন, ‘আলীগঞ্জ অংশটি আগে জলাধার ছিল। নির্মাণকাজের সুবিধার জন্য সেখানে অস্থায়ীভাবে মাটি ভরাট করে প্রবেশপথ তৈরি করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সেই মাটি সরিয়ে জলাশয় পুনরুদ্ধারের কাজ চলছিল। ৭৬ থেকে ৯০ পর্যন্ত পিলারের ৬০০ মিটার এলাকায় এ কাজের পরিকল্পনা ছিল। সেনাবাহিনী ও চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে কাজ হয়েছে। পিলারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনও শঙ্কা নেই। স্থানীয় লোকজন না বুঝে ফেসবুকে ভুল তথ্য ছড়ায়।’
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মা রেলসেতুর নিচ থেকে মাটি কাটার খবর পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ পাঠিয়ে কাজ বন্ধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে নথি তলব করা হয়েছে। তারা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কাজের সুবিধার্থে রাস্তা তৈরি করবে এবং প্রকল্পের কাজ শেষে মাটি সরিয়ে নেবে—এমন চুক্তি ছিল। তারা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরেজমিনের তথ্যমতে এভাবে মাটি কাটার সুযোগ নেই বলে আমাদের মনে হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এতে সেতুর কোনও ঝুঁকি নেই জানাতে হবে। সেই ধরনের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হবে না। বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এখন আমরা আর মাটি কাটতে দেবো না।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাটিকাটার স্থানটি রেলওয়ের অধিগ্রহণ করা জমি। ঠিকাদার প্রকল্পের আওতায় ভায়াডাক্ট নির্মাণের সময় একটি অস্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ শেষে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় স্থানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় ভরাট করা সেই মাটি অপসারণ করে স্থানটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। বিষয়টি পদ্মা রেলসেতু সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট বাংলাদেশ আর্মির’ মাধ্যমে তদারকি করা হচ্ছিল এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মাটি অপসারণের কারণে রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামোর কোনও ক্ষতি হয়নি বা হবে না। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ওই স্থান থেকে মাটি অপসারণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই স্থানে সরকারের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আলীগঞ্জ এলাকায় পদ্মা রেলসেতুর ৮৫, ৮৬ ও ৮৭ নম্বর পিলারের নিচে ও আশপাশ থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। তবে কারা এই কাজ করছেন, তা ভিডিওতে স্পষ্ট নয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিনটি পিলারের নিচে ও আশপাশে ৮ থেকে ১০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে দিনে-রাতে মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকে করে আশপাশের ইটভাটায় মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় লোকজন মাটি কাটায় বাধা দিলেও প্রভাবশালীদের ভয়ভীতির কারণে মাটি কাটা বন্ধ হয়নি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার আবুবক্কর ও তার অনুসারীরা সেতুর পিলারের গোঁড়া থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছেন। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে কুতুবপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আবুবক্কর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি সেখান থেকে মাটি কেটে নিইনি। ফতুল্লার কিছু লোকজন কেটে নিয়েছেন। আমার জানামতে, মাটি কাটার অনুমতি আছে।’









