ভারতের সঙ্গে নীবিড় বন্ধুত্ব চেয়েছে সরকার দলীয় সাংসদরা। একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী দল এবং বাংলাদেশে মসজিদের ভেতর রাজনীতিও নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে দলটি। ভারত-বাংলাদেশে সীমান্তে পুশইন, বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য ও মাদক প্রতিরোধে পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে থামাতে ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি-দলীয় এক সংসদ সদস্য।
সোমবার (২২ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১২তম দিনে জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এবং পয়েন্ট অর্ডারে দাঁড়িয়ে সরকার-দলীয় সংসদ সদস্যরা এসব দাবি তোলেন।
বগুড়া-৫ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) সিরাজ বাজেট আলোচনায় দাঁড়িয়ে বলেন, “আমরা সবাই চাই ভারত-বাংলাদেশ সম্মানজনকভাবে আমাদের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখি। কারণ আমি বিশ্বাস করি যে ভারত আমাদের প্রতিবেশী। আমরা বন্ধুত্ব যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, স্বামী-স্ত্রী ডিভোর্স হতে পারে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের এই প্রতিবেশীর সম্পর্কে ডিভোর্স হতে পারে না। প্রতিবেশীকে আমরা কখনও অস্বীকার করতে পারি না— না ভারত পারবে, না বাংলাদেশ পারবে।”
জিএম সিরাজ বলেন, “আমি মোদী সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি সবিনয়ে। একই সঙ্গে আমি বলতে চাই— পশ্চিমবঙ্গে যে আপনার চিফ মিনিস্টার শুভেন্দু বাবু, তাকে থামান। বাংলাদেশবিরোধী যেসব বক্তব্য আসছে, মাঝেমধ্যে যেসব সমস্ত বক্তব্য দিচ্ছেন— এই বক্তব্য ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়ে গেছে।”
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ রেজা আহমেদ বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চলে গেলেন। আমি একটি রাজনৈতিক কথা বলতে চাই। দেশে মসজিদের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। মসজিদ আল্লাহর ঘর। মসজিদে মানুষ নামাজ পড়বে, মসজিদে কোরআন শরীফ পড়বে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে গিয়ে রাজনীতি করে।”
তিনি বলেন, “মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইন পাশ করার অনুরোধ করবো— মসজিদ, মাদ্রাসায় রাজনৈতিক মিটিং করা যাবে না। আমরা যেমন প্রকাশ্যে ফুটবল মাঠে বা হাই স্কুলে বা কোনও হলরুমে কর্মীসভা করি, তাদেরও সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তারা মসজিদে মিটিং করতে পারবে না।”
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদল জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে ফ্যাসিস্টদের মতো দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়েছেন ঝালকাঠি-১ আসনের বিএনপি-দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। তিনি বলেছেন, “যে দলটি ১৯৭১ সালে এই দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যে দলটি বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল, আমি মহান সংসদে দাবি করবো— তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না। তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মতো নিষিদ্ধ করা হোক।”
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটকে সম্পূর্ণ ‘অবাস্তব ও বাস্তবায়ন অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী। তিনি বলেছেন, “এই বাজেটে সম্পদের সুষম বণ্টন হয়নি, বরং বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নকে এই বাজেটে চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে। এই বাজেট গরিব মারার বাজেট।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বগুড়ার শিবগঞ্জে ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু গাজীপুরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে ৯০ শতাংশ বেশি। ১ ও ২ নম্বর আসনের মধ্যে যদি বরাদ্দের পার্থক্য ৯০ ভাগ হয়, তবে আমরা বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা কোথায় কোন বাজেট পাবো?”
অপরদিকে গাইবান্ধায় শিবিরনেতা সাইফুল্লাহ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। জাতীয় সংসদে ফ্লোর নিয়ে তিনি বলেন, “গাইবান্ধায় একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যুবদল-ছাত্রদলের নেতারা ছাত্রশিবিরের ইউনিয়ন সভাপতি সাইফুল্লাহকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনও আসামি গ্রেফতার হয়নি।” রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “খুনি যে দলেরই হোক তাকে গ্রেফতার করতে হবে। খুনি সে দলেরই হোক না কেন, সে খুনিই।” তিনি এই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মবোক্রেসি
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মিছিল ও প্রতিবাদকে ‘মবোক্রেসি হিসেবে অভিহিত করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শব্দটি কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানানো হলেও তা নাকচ করে দিয়েছেন স্পিকার।
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে জামায়াতে ইসলামী যে মিছিল ও প্রতিবাদ করেছে, কথা প্রসঙ্গে এক সদস্য সেটিকে ‘মবোক্রেসি’ বলেছেন।” শব্দটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার জন্য রাশেদুল ইসলাম স্পিকারকে অনুরোধ জানান।
তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “মাননীয় সদস্য, এটা কোনও অশ্লীল শব্দ না। আপনার যখন বাজেটে বলার টার্ন (পালা) আসবে, তখন এটার ভালোভাবে জবাব দেবেন। এখন এটা এক্সপাঞ্জ হওয়ার মতো কোনও কিছুই নাই।” পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “মবোক্রেসি শব্দটা আসলে কোনও ভালো অর্থ বহন করে না। নিশ্চিতভাবেই এটি একটি আপত্তিকর শব্দ এবং আমার ধারণা তিনি (সংশ্লিষ্ট সদস্য) খেয়াল করলে এটা বলতেন না, বেখেয়ালে বলে ফেলেছেন।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, “এই ধরনের বাজেটের প্রতিক্রিয়া আমরাই প্রথম করিনি, এর আগে বহুবার বিএনপি করেছে, অনেকেই করেছে। তাহলে কি সবকিছুই ‘মবোক্রেসি’ ছিল? আমার মনে হয়, এই শব্দটা এখানে বেমানান এবং এটা এক্সপাঞ্জ করাই উচিত।”
বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্যের পর স্পিকার বলেন, “মবোক্রেসি শব্দটা এখন একটি সাধারণ বা কমন টার্মে পরিণত হয়েছে। সবার বক্তৃতাতেই এটা শোনা যায়। এটি কোনও অশ্লীল শব্দ নয়।”
শব্দটিকে অসংসদীয় মনে করার কোনও কারণ নেই জানিয়ে স্পিকার সদস্যদের উদ্দেশে আরও বলেন, “আপনারাও আপনাদের বক্তব্যে এই শব্দ ইউজ করতে পারেন। এটি রাজনীতিতে নিন্দনীয়, ডেমোক্রেসির বিরুদ্ধে, কিন্তু এটি অশ্লীল শব্দ না। ফলে সংসদে এক্সপাঞ্জ হওয়ার মতো শব্দ এটি নয়।”
মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি
এদিকে জাতীয় সংসদে চলমান বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। এসময় সংসদে মন্ত্রীদের এমন অনুপস্থিতি নিয়ে খোদ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও উষ্মা প্রকাশ করেন এবং অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও বেশি উপস্থিতি দেখতে চান বলে মন্তব্য করেন। গতকাল অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রীদের আসনগুলো খালি দেখে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, “আমি লক্ষ করছি, বাজেট অধিবেশনে অধিকাংশ সময় আমাদের মন্ত্রীরা থাকেন না। এইখানে দেখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তারপরে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অনেক মন্ত্রী নাই। মন্ত্রীদের চেয়ার সব খালি। এই ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা চাচ্ছি মাননীয় স্পিকার।”
সাইফুল আলম খানের প্রশ্নের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “বাজেট অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও উপস্থিতি দেখতে চাই। শোকর করেন যে, অর্থমন্ত্রী অন্তত আছেন এখানে।” স্পিকার আরও বলেন, “বাজেট সেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেশন, তাই অন্য মন্ত্রীদের উপস্থিত থাকার জন্য সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হবে।”
এরপর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন, তবে সংসদে তাদের উপস্থিত থাকা উচিত।”
অর্থমন্ত্রীর সার্বিক উপস্থিতির প্রশংসা করে চিফ হুইপ বলেন, “মাননীয় অর্থমন্ত্রী আগাগোড়াই এখানে উপস্থিত আছেন। বাজেটসংক্রান্ত বিষয়ে যদি কথা বলা হয়, শেষ কথা অর্থমন্ত্রীই বলবেন। স্বাস্থ্য খাতের কথা বলবেন, বিদ্যুৎ খাতের কথাও বলবেন, পুলিশের কথাও বলবেন, আইনের কথাও বলবেন, সব কথাই অর্থমন্ত্রী বলবেন। সেই কারণে মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রেজেন্ট থাকেন।”
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দলের মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) সব সময় উপস্থিত থাকেন এবং অন্য মন্ত্রীদেরও তিনি সংসদকে উপভোগ করার জন্য উপস্থিত থাকার আশা প্রকাশ করেন।
বিরোধী দলের এই সমালোচনার জবাব দেন টাঙ্গাইল-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্য বললেন, “আমাদের মন্ত্রীরা নাই, বলার আগে যদি নিজের দিকে তাকিয়ে বলতেন, সংসদে বিরোধী দলের নেতা এবং উপনেতা দুজনের কেউই নাই। তারাও যাতে ঠিকমতো থাকেন।”
প্রতিমন্ত্রীর এই পাল্টা যুক্তির পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “বিরোধী দলের নেতা না থাকলে অসুবিধা নাই, মন্ত্রীদের থাকা প্রয়োজন। তাদের সমস্যা তো মন্ত্রীদের পক্ষেই তারা বলবেন।” তবে সংসদের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সরকারি ও বিরোধী, উভয় পক্ষের সবার অধিবেশনে থাকা বাঞ্ছনীয় বলে মন্তব্য করেন স্পিকার।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা তারেক রহমান বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বর্তমানে মালয়েশিয়া রয়েছেন।
সোমবার (২২ জুন) বিকালে সংসদের বৈঠকের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। সোয়া ৩টার দিকে দেখা যায় সরকারি দলের প্রথম সারিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীসহ ৪ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত রয়েছেন। এসময়ে প্রথম তিন সারিতে চিফ হুইপ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জমানসহ ৬৪টি আসনের মধ্যে ২১ জন উপস্থিত ছিলেন। তিনটা ২০ মিনিটের দিকে সংসদের বৈঠকে যোগ দেন অর্থমন্ত্রী। এসময় বিরোধী দলের প্রথম সারিতে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মো. তাহের অনুপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এই সময় উপস্থিত ছিলেন। সংসদের বৈঠকের শুরুর দিকে সরকারি দলের তুলনায় বিরোধী দলের সদস্যদের উপস্থিতি কিছুটা বেশি ছিল। অবশ্য সরকারি দলের সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।







