পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক রদবদল শুরু করেছে সরকার। পররাষ্ট্র সচিব থেকে শুরু করে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে নতুন করে রাষ্ট্রদূত পদায়ন করা হচ্ছে। সামনে আরও রদবদলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যেও কিছু নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে পদায়ন করা হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, মূলত সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ঘিরে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বলয় আরও শক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কিছু সিদ্ধান্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষও তৈরি হচ্ছে।
সরকারের বড় রদবদলের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে—নতুন পররাষ্ট্র সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এবং নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খানের নিয়োগকে। তবে দুটি নিয়োগকে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেখা হচ্ছে। একটি হচ্ছে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে বিএনপি’র তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানকে এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মোহাম্মদ আব্দুল মুহিতের নিয়োগকে।
জাতিসংঘে কেন আইরিন খান
মানবাধিকার কর্মী আইরিন খানকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার ও কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, মানবাধিকার কর্মী আইরিন খানের নিয়োগ সরকার কৌশলগত কারণে দিয়েছে। সরকার মনে করে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকার, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আইরিন খান অত্যন্ত সুপরিচিত। তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে দক্ষতা বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান কার্যকরভাবে তুলে ধরা এবং দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে আইরিন খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আইরিন খান জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই তার নতুন দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে। আইরিন খান আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বর্তমানে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের মুক্তচিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের দায়িত্বে আছেন। এর আগে তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জাতিসংঘে কাজ করেছেন সাবেক একজন কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আইরিন খানের জাতিসংঘে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। এটা দেশের জন্য একটি প্লাস পয়েন্ট। নতুন কাউকে এই জায়গায় দিলে তার এই বলয়ের মধ্যে কাজ করার জন্য সময়ের প্রয়োজন হতো। দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা করি। জাতিসংঘে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হচ্ছে। একটি ইউএনজিএ সভাপতি পদ, আরেকটি হচ্ছে আইরিন খানের নিয়োগ।’’
রাজনৈতিক নিয়োগে কেন
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিএনপি’র তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানকে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছেন। তিনি মূলত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তবে ব্যাংকিং ও রিমোট সেন্সিং বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে ওয়াহিদুজ্জামানের। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা ও অভিবাসন-বিষয়ক বহু আন্তর্জাতিক প্রকল্পে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভূগোল বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধও রয়েছে তাঁর।
ওয়াহিদুজ্জামানের এই অভিজ্ঞতা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা ও কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে সরকার।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির রেক্টর মোহাম্মদ আব্দুল মুহিতকে। তিনি মূলত একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক। নিউ ইয়র্ক, ভিয়েনা, ওয়াশিংটন ডিসি এবং মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয় গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংগুলোতে তিন দশকেরও বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া বহুপাক্ষিক অনুশীলনকারী, জাতিসংঘের শাসন, টেকসই উন্নয়ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে তিনি বিশেষজ্ঞ। জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নানা বিষয়ে কাজ করেছেন তিনি। ২০২২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের পর থেকে রাষ্ট্রদূত মুহিত জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের সভাপতি, ইউএন উইমেনের নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি এবং ইউএনডিপি, ইউএনএফপিএ, ইউএনওপিএসের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাষ্ট্রদূত মুহিতের জাতিসংঘে কাজ করার এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় আব্দুল মুহিতকে। এ ছাড়া জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রচারণার জন্য খুব অল্প সময় পাওয়া গেছে। এই সময়ের মধ্যে সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এবং আব্দুল মুহিত জাতিসংঘের নির্বাচনে প্রচারণার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। লন্ডন হাইকমিশনের পদটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বাংলাদেশের কমিউনিটির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে সরকার মনে করে।
তবে তাদের নিয়োগ নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের মধ্যে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, অথবা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূত হওয়ার যোগ্য। পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রদূত হয়ে থাকেন এবং সেটি চুক্তিভিত্তিক নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে থেকে যোগ্য যে কাউকে চুক্তিভিত্তিক রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন রাষ্ট্রপতি।
তবে পিআরএলে যাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ বাড়ালে, কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে মধ্যম সারির কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে বঞ্চিত হন। এ প্রসঙ্গে একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নিয়ম অনুযায়ী ৫৯ বছরে পিআরএল-এ যেতে হয়। এই নিয়ম ঠিকমতো মেনে চললে মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রদূত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমানে যে সিস্টেম চলছে, সেটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের প্র্যাক্টিস চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সবাই মেয়াদ বাড়িয়ে কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য তদবির শুরু করবেন।
রদবদল যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাবেক একজন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘‘পদায়নের ক্ষেত্রে এটাই দেখা জরুরি যে তিনি যোগ্য কিনা। মিশনগুলোতে যোগ্য লোক না পাঠালে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয় না। তবে এটাও ঠিক, ঘন ঘন বদলির কারণে একজন কূটনীতিক তার পোস্টে কাজ করতে পারেন না। কারণ একটা দেশে তার পোস্টিং মানেই হচ্ছে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা। সেক্ষেত্রে কিছুটা সময় দেওয়ার প্রয়োজন আছে।’’
আরও যেসব রদবল হয়েছে
জাতিসংঘ এবং লন্ডনের কূটনীতিক মিশনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি জায়গায় রদবদল করা হচ্ছে। বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হচ্ছে। দিল্লিতে বর্তমান হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থানী মিশনে পাঠানো হচ্ছে।
এছাড়া সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (আন্ত-সরকারি সংস্থাগুলো) এম ফরহাদুল ইসলামকে মরিশাসে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি জকি আহাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন। সরকার এরই মধ্যে জকি আহাদকে ডেনমার্কে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত তিনটি দেশে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছে। জকি আহাদ ছাড়া নতুন নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রদূতরা হলেন—আয়ারল্যান্ডে নুর-ই আলম এবং আর্জেন্টিনায় এএফএম জাহিদুল ইসলাম। এ ছাড়া পর্তুগালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি নাহিদা সোবহানকে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির রেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
সরকার কী বলছে
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন ও রদবদল একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সরকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত জানানো হলে, তখনই সবাই জানতে পারবেন— কোথায়, কেন এবং কী কারণে রদবদল করা হয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
রদবদলে রাজনৈতিক পরিচয়কে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘‘সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষতা, যোগ্যতা এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে কর্মদক্ষতা ও দায়িত্বশীলতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সব মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেই দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং ব্যক্তির যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই প্রয়োজনীয় রদবদল করা হয়।’’









