সরকারি চাকরিজীবী, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিধান এক নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও চাকরি ছাড়ার পর প্রার্থী হওয়ার নিয়মে রয়েছে পার্থক্য। এর মধ্যেই এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধে উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, কোনও শিক্ষক নির্বাচন করতে চাইলে চাকরি ছেড়ে দিতে হবে। আগামীতে শিক্ষকরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এমন খবরে বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সরকার চাইলে পরিপত্র জারি করেই আইন হওয়ার আগ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি চাকরিজীবী, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের নিয়ম এক নয়। আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও চাকরি ছাড়ার পর প্রার্থী হওয়ার বিধান আলাদা।
সংসদ নির্বাচনে সরকারি চাকরিজীবীদের ৩ বছরের বাধা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ছ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের চাকরি বা কোনও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকরিতে থাকা ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। চাকরি থেকে পদত্যাগ বা অবসরের পরও তিন বছর অতিবাহিত না হলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য থাকেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিয়ম ভিন্ন
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য পৃথক আইন রয়েছে। এসব আইনে সাধারণভাবে প্রজাতন্ত্রের বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চাকরিতে বহাল থাকা ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনও সরকারি কর্মকর্তা চাকরিতে বহাল থেকে মেয়র, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা সদস্য পদে নির্বাচন করতে পারেন না।
তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চাকরি ছাড়ার পর তিন বছর অপেক্ষার কোনও সর্বজনীন বিধান নেই। ফলে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে বহাল আছেন কিনা এবং সংশ্লিষ্ট আইনে তার পদ অযোগ্যতার আওতায় পড়ে কিনা; সেটিই মূল বিষয়।
এ কারণে একই সরকারি কর্মকর্তা সংসদ নির্বাচনে চাকরি ছাড়ার পর তিন বছর অপেক্ষা করতে বাধ্য হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই ধরনের অপেক্ষার বিধান নেই।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কেন আলাদা
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি চাকরিজীবী নন। তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তাদের বেতন-ভাতার একটি অংশ সরকার এমপিও ব্যবস্থার মাধ্যমে দিলেও নিয়োগ, চাকরি ও প্রশাসনিক অবস্থান সরকারি চাকরির মতো নয়। এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের নির্বাচনি অযোগ্যতার বিধান তাদের ওপর সরাসরি প্রযোজ্য হয় না। ফলে বর্তমান আইনি কাঠামোয় এমপিওভুক্ত কোনও শিক্ষক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পান, যদি সংশ্লিষ্ট আইনে তাদের জন্য আলাদা কোনও অযোগ্যতা নির্ধারণ করা না থাকে।
অবশ্য এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। ইসির উদ্যোগের লক্ষ্য, স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত আইনগুলোতে এমন বিধান যুক্ত করা, যাতে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে কোনও এমপিওভুক্ত শিক্ষক মেয়র, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা সদস্য পদে প্রার্থী হতে চাইলে আগে চাকরি ছাড়তে হবে। তবে চাকরি ছাড়ার পর সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে, নাকি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হবে—সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো তিন বছরের অপেক্ষার বিধান হবে কিনা, সেটিও আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, চাকরি না ছেড়ে নির্বাচন করা যাবে না। তবে রাজনীতি করা যাবে কিনা, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোন অবস্থানে
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পৃথক একটি শ্রেণি। তাদের চাকরির শর্ত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, সংবিধি ও বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শিক্ষক বা বেতনভোগী কর্মচারীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগে চাকরি থেকে পদত্যাগের শর্ত রয়েছে। ফলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে শুধু সরকারি চাকরিজীবী বা বেসরকারি শিক্ষক—কোনও এক শ্রেণিতে ফেলা যায় না।
চাকরি ছাড়লেই কি নির্বাচন করা যাবে
তাদের মতে, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া এবং পদত্যাগ কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও চাকরি থেকে অব্যাহতির তারিখ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এক আইনে অভিন্ন বিধান কি সম্ভব
বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন পৃথক আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। নির্বাচন কমিশনের আইন সংক্রান্ত তালিকাতেও এসবের জন্য পৃথক আইন ও বিধিমালা রয়েছে।
ফলে কোনও একটি শ্রেণির চাকরিজীবীর প্রার্থিতা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একাধিক আইন সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিয়ম এক নয় কেন
জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাষ্ট্রের আইনসভা গঠনের নির্বাচন। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন স্থানীয় প্রশাসন ও সেবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সংবিধানে সংসদ সদস্য নির্বাচনের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার ক্ষেত্রে সরাসরি তিন বছরের বিধান রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে পৃথক আইন করে আলাদা কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একজন সরকারি কর্মকর্তা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে তিন বছরের বাধার মুখে পড়লেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একই বাধার মুখে নাও পড়তে পারেন। বিষয়টি আইনগত অসামঞ্জস্য কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
জানতে চাইলে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিক্ষক একজন নাগরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার রাখেন। তবে শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যেখানে নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা এবং শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ স্বার্থ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তাই নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে চাকরি থেকে পদত্যাগ বা নির্ধারিত নিয়মে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির বিধান থাকলে তা নীতিগতভাবে বিবেচনাযোগ্য। তবে এ ধরনের আইন অবশ্যই সংবিধানসম্মত, বৈষম্যহীন এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ্ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কিছু সুযোগ-সুবিধা কম পেলেও বর্তমানে দুপক্ষের সুবিধা প্রায় কাছাকাছি। তাই সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।
তার ভাষ্য, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অনেক বেশি। শিক্ষকরা গভর্নিং বডিতে রাজনৈতিক ব্যক্তি না চাইলেও নিজেরা রাজনীতি করবেন—এটি যৌক্তিক নয়। চাকরিতে থাকা অবস্থায় রাজনীতি করা কিংবা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়; পাঠদানে মনোযোগই শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে পরিবর্তনের সুপারিশ চূড়ান্ত করলো ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি







