রংপুর সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার আড়ালে বহুমুখী ব্যবসা, আবাসন কোম্পানি পরিচালনা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি নামের এক সহকারী শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। উপজেলার নুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত এই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে প্রায় ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৩ বছরের সরকারি চাকরি জীবনে লিমি ও তার স্বামী খোরশেদুর রহমান প্রিন্স দম্পতি সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। রংপুরে নামিদামি গাড়িতে চলাচল করলেও প্রভাবশালী হওয়ায় সহকর্মীরা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। রংপুরে সরকারি চাকরি করলেও ঢাকার উত্তরায় রাজউকের ফ্ল্যাট এবং রংপুরের আর কে রোডে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ পুরো ভবনের মালিকানা রয়েছে তাদের। এ ছাড়া প্রিন্সমার্ট লিমিটেড নামের একটি লাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়মিত ঢাকায় বোর্ড মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমির ট্যাক্স সার্কেল ১৩-এর আয়কর টিন নম্বর অনুযায়ী (টিন নম্বর: ২৭৯২৬৫৬৯৪১৬৩) তার আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও জমি কেনাবেচা, প্লট আকারে বিক্রি এবং এমএলএম ব্যবসায় সরাসরি যুক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযুক্ত শিক্ষিকা ও তার স্বামী ‘সাবওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামের এজেন্সির মাধ্যমে হজ ও ওমরাহ ব্যবসায় জড়িত। এই ব্যবসার আড়ালে বিমানবন্দর দিয়ে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ওমরাহগামী যাত্রীদের ফেরার সময় অতিরিক্ত স্বর্ণালংকার পরিধান করিয়ে ট্যাক্স ছাড়াই তা দেশে এনে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ স্বর্ণের ব্যবসা চালিয়ে আসছেন এই দম্পতি এমন অভিযোগ আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামীমা দিলরুবার স্বামী খোরশেদুর রহমান প্রিন্স মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল এবং হাউজিং ব্যবসার মাধ্যমে বিশাল অর্থ কামিয়েছেন। রংপুর মডার্ন প্রিন্স সিটি এবং রংপুর কাচারি বাজার সংলগ্ন ১৫তলা ভবন নির্মাণের কথা বলে ‘হাজী গ্র্যান্ড প্রোপার্টিজ’ কোম্পানি খুলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। দর্শনার দেওডোবায় মডার্ন সিটিতে বিনিয়োগের প্রলোভন এবং ৫ লাখ টাকায় ১২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের চটকদার বিজ্ঞাপনে বহু মানুষ প্রতারিত হয়েছেন।
প্রতারণার শিকার মো. হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী জানান, রংপুর সিটি করপোরেশনের ২৭ ও ২৮ নম্বর প্লটে রংপুর সিটি হার্ট প্রকল্পে দ্বিগুণ লভ্যাংশের আশায় অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও দুই বছর পেরিয়ে কাজ শুরু হয়নি। ইতোমধ্যে চেক প্রতারণার মামলায় খোরশেদুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এছাড়া বিগত সরকারের সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ের এক জুডিশিয়াল কর্মকর্তার প্রভাবে এই দম্পতি রংপুরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিনিয়োগকারী জানান, ব্যাংক পে অর্ডারের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হলেও সেই অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। টাকা ফেরত চাইতে গেলে ওই দম্পতি দুর্ব্যবহার করেন এবং যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
তবে সরকারি চাকরিজীবী হয়েও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে বোর্ড মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি। তিনি দাবি করেছেন, কোনও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন।
তবে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষিকা শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তের পর এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।’
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি শিক্ষকতা করেও জমির দালালি, স্বর্ণ ব্যবসা এবং আবাসন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠার পর ওই শিক্ষিকাকে শ্রেণিকক্ষ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষিকা শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ঢাকায় এবং রংপুরে ফ্ল্যাট ও প্লটসহ যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে সবই আমার স্বামীর। তার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। ফলে সম্পদ থাকা স্বাভাবিক। আমি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করছি। তাকে সংসারে কোনও টাকা দিতে হয় না। তবে স্বামী আমাকে মাসে মাসে টাকা দেন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসেবে আমার অনেক জমিজমা ও সম্পদ আছে। শিক্ষকতা করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে কামানো যায় না। আমার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে। আমার কোনও অবৈধ সম্পদ নেই।’









