লজিস্টিক ব্যয় কমানোর তাগিদ বাণিজ্যমন্ত্রীর

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
৩০ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৩ আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৬:০৩

দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লজিস্টিক ব্যয় কমানো, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, “কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা গেলে মূল্যশৃঙ্খলের কোন পর্যায়ে অস্বাভাবিক ব্যয় বা মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে।” 

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাজারব্যবস্থা, মুনাফার মার্জিন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সংলাপে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও মূল্য নির্ধারণের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। 

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে লজিস্টিক ব্যয়ের উচ্চহার, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারব্যবস্থার বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারের অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও কমাতে হবে। 

তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত তারল্য, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে তা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।” 

জিডিপির ১৬ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয়

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি স্থায়ীভাবে বেশি থাকার অন্যতম কারণ উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে গড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে বাংলাদেশে এই ব্যয় প্রায় ১৬ শতাংশ।” 

এই ব্যয় কমানো গেলে খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। 

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “বাজারে তথ্যের অসমতা কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। টানা কয়েক বছর আলুর ন্যায্যমূল্য না পেলেও কৃষকেরা একই পরিমাণ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, কৃষকের কাছে বাজারের সঠিক তথ্য এবং বিকল্প উৎপাদন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছাচ্ছে না।” 

কৃষিপণ্যের চাহিদা, উৎপাদন ও সম্ভাব্য বাজারমূল্য সম্পর্কে কৃষকদের আগাম তথ্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সরবরাহব্যবস্থায় আসছে ট্রেসেবিলিটি

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, “এই ব্যবস্থা চালু হলে পণ্যটি কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কীভাবে পরিবহন করা হয়েছে, কোন কোন পর্যায় অতিক্রম করেছে এবং কোথায় কত ব্যয় বা মূল্য সংযোজন হয়েছে— তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে মূল্যশৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং অস্বাভাবিক ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।” 

বাজারে বিদ্যমান অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে এসব ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

কৃষিতে বিনিয়োগ সক্ষমতা সীমিত 

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “দেশে প্রায় এক কোটি ৭৮ লাখ কৃষক পরিবার সীমিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করছে। তাদের সঞ্চয়ের সুযোগ খুবই কম। ফলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং উচ্চ উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগের সক্ষমতাও সীমিত।” 

এই জন্য কৃষিকে আরও বেশি রাষ্ট্রীয় সহায়তা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার কৃষি খাতে ভর্তুকি এবং সার, বীজ ও সেচ সুবিধা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তবে এখন কৃষিকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরের সময় এসেছে।” 

দেশের মাটি, জলবায়ু ও কৃষির বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, “কৃষি শিল্পের মতো নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হয় না। এই খাত প্রকৃতি, আবহাওয়া এবং বিভিন্ন বাহ্যিক ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল। তাই জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।” 

খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এগুলো হলো— লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। 

তিনি বলেন, “উৎপাদনশীলতা বাড়লে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে ভোক্তাদের কাছে সহনীয় দামে খাদ্যপণ্য সরবরাহ করাও সহজ হবে।” 

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার মণ্ডল, সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মাজিদ এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা। 

/জেইউ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়াতে উদ্যোগ
বাজারের সব সয়াবিন তেল বিশুদ্ধ, কোনও ভারী ধাতু নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
ভোক্তার কেনা পণ্যের মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব: শিল্পমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, পিএসজি-বার্সা ম্যাচ নিয়ে যা জানা গেলো
দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, পিএসজি-বার্সা ম্যাচ নিয়ে যা জানা গেলো
নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির