বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিল’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের কোনও কোনও দেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীল খাতের অবদান ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ ওই পর্যায়ে যেতে না পারলেও ২ থেকে ৩ শতাংশে নিতে পারলে— এ খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষকে যুক্ত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এ খাতে কাজ ও উদ্যোক্তা হওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের খাবার, সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সৃজনশীল কাজকে বৈশ্বিক বাজারে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গ্রাম-গঞ্জের গান, খাবার ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে পণ্য হিসেবে গড়ে তুলে বিশ্ববাজারে বিক্রি করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক গান ও সৃজনশীল কাজ রয়েছে, যেগুলো এতদিন অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। যথাযথ সহায়তা, প্রশিক্ষণ, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের মাধ্যমে এসব সৃজনশীলতাকে বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, একটি ছোট গান জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেটিও বড় অর্থনৈতিক পণ্যে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতার অভাব নেই— প্রয়োজন শুধু সেই সৃজনশীলতাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা।
তথ্যপ্রযুক্তি ও মুক্ত পেশায় যুক্ত তরুণদের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন আমির খসরু। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করা এবং মুক্ত পেশায় যুক্ত মানুষের সৃজনশীলতাকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করতে হবে।
থাইল্যান্ডের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে গ্রামের মানুষ নিজেদের বাড়িতে পণ্য তৈরি করেন। সরকারের সহায়তায় কাঁচামাল, দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা, মানোন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে এসব পণ্যকে বিশ্ববাজারের উপযোগী করা হয়। পরে পণ্যগুলো সংগ্রহ করে সরাসরি বিমানবন্দরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এ ধরনের সহায়তা কাঠামো তৈরি হলে গ্রামের সৃজনশীল মানুষকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে। এতে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু ঋণ দিলেই হবে না। ঋণগ্রহীতার পণ্যের মানোন্নয়ন, দক্ষতা, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের বিষয়েও সহায়তা দিতে হবে। স্থানীয় একটি পণ্যকে কীভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করা যায়, সে পরিকল্পনা ব্যাংককে করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে অনেক সৃজনশীলতা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে তারা সেই সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেন না। আবার অনেকেই ব্যাংকে যেতে ভয় পান বা ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে রয়েছেন। তাই সবার জন্য অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থমন্ত্রী জানান, কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ এবং কুটিরশিল্পই বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বড় শিল্প ও বড় প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের কাজ করলেও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে তাদের ব্যবসা বড় করতে পারছে না।
সৃজনশীল খাতে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু ঋণ নয়, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনেও সহায়তা দিতে হবে। এতে ১০০ টাকার একটি পণ্যকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার পণ্যে উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে। পরে এসব পণ্য অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন বিপণন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়া যাবে।
সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও ওটিটি খাতের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব সৃজনশীল পণ্যের ভৌগোলিক সীমা নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শিল্পী ও সৃজনশীল পেশাজীবীদেরও অর্থায়ন ও অন্যান্য সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতি কোনো দাতব্য কার্যক্রম নয়; এটি অর্থনীতিরই একটি অংশ। এখান থেকে অর্থনৈতিক সুফল, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংককে প্রচলিত খাতের পাশাপাশি সংগীত, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সৃজনশীল খাতের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদেরও ঋণের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু অর্থায়ন করলেই হবে না, ঋণগ্রহীতার সঙ্গে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক থাকতে হবে। উদ্যোক্তাকে শুধু ঋণগ্রহীতা হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি তা ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এতে ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের পাইলট প্রকল্পে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি প্রাথমিকভাবে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য অর্থায়নের সুযোগ তৈরিতে কর্মসংস্থান ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জামানত ছাড়াই এসব জনগোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার জানান, এ প্রকল্পের আওতায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণে যেখানে সুদের হার ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে এ উদ্যোগের ঋণ তুলনামূলকভাবে কম সুদে দেওয়া হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে এ উদ্যোগ সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে তিনটি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে— পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলায় সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. এ এফ এম মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ২ শতাংশ সুদে তহবিল সরবরাহ করে, তাহলে কর্মসংস্থান ব্যাংক আরও কম সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে।
তিনি জানান, বর্তমানে কর্মসংস্থান ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। কম ব্যবধানের সুদে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় ঋণের সুদের হারও তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হচ্ছে।









