জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটিতে বহিষ্কৃত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে (জি এম নজরুল ইসলাম) অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও রসিকতা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতার আপত্তির পর শেষ পর্যন্ত কমিটি পুনর্গঠন করে গাজী নজরুলকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপনের পর এ নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা, দল থেকে তার বহিষ্কার এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার কথোপকথনে রসিকতাও উঠে আসে।
প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
আজ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদ নেতার অনুমতিক্রমে সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত কমিটির সদস্যদের তালিকায় গাজী নজরুল ইসলামের নাম ছিল। কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হলে কমিটি গঠিত হয়।
কমিটি গঠনের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জানতে চান, গাজী নজরুল ইসলামকে বিরোধী দলের কোটা থেকে সদস্য করা হয়েছে কিনা?
জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংসদে থাকা ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের প্রত্যেককে অন্তত একটি কমিটিতে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। গাজী নজরুল ইসলামকে এর আগে কয়েকটি স্থায়ী কমিটিতে রাখা হয়েছিল। তবে বিরোধীদলীয় নেতার চিঠি বা অনুরোধের পর তাকে সেসব কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
চিফ হুইপ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে গাজী নজরুলকে রাখা সম্ভব হয়নি। তাই সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটিতে তাকে রাখা হয়েছে। এ কমিটি সাধারণত খুব বেশি বৈঠক করে না—বছরে এক-দুবার, এমনকি পাঁচ বছরে এক-দুবারও বৈঠক হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল না, সরকারি দলও না—ওনাকে কোনও কমিটিতে রাখা সম্ভব হয়নি। সেই হিসেবে গাজী নজরুল ইসলামকে এখানে রেখেছি।’
‘দুর্বল মানুষকে মেম্বার ইলেকশনে দাঁড় করিয়ে দিতে হয়’
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে বিরোধী দলের কোটা থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। ফলে তাকে এখানে রাখায় তাদের আপত্তি নেই। তবে নৈতিক কারণে দল থেকে বহিষ্কার করা একজন সংসদ সদস্যকে জাতীয় সংসদের কোনও কমিটিতে না রাখাই উত্তম ছিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি সংসদের প্রচলিত একটি রসিকতার কথা তুলে ধরেন। শফিকুর রহমান বলেন, ‘গ্রামে একটা কথা চালু আছে—কোনও দুর্বল মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে হলে তারে মেম্বার ইলেকশনে দাঁড় করায়ে দেওয়া।’
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝে মাঝে এরকম কিছু টিপস দেন, আমরা এনজয় করি।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে তিনি দলের সদস্য হয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করেছেন—এমন কথা বলার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের পুনর্মূল্যায়ন ও পরিবর্তন করা হয়। তাই নৈতিকতার দিক থেকে গাজী নজরুলকে কোনও কমিটিতে না রাখাই ভালো হতো।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে ‘বিনা পয়সায় বুদ্ধি’
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনও রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হলেই একজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যায় না। নিজে পদত্যাগ না করলে বা সংবিধানের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে শুধু দল থেকে বহিষ্কারের কারণে সদস্যপদ বাতিল হয় না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গাজী নজরুল ইসলাম দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোটদানে বিরত থাকলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি আসতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যি সত্যিই চান তার আসনটি শূন্য হোক, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোট দেন নাই, ভোটদানে বিরত ছিলেন—সেই জায়গায় ৭০ অনুচ্ছেদ আসে।’
এ বিষয়ে স্পিকার বা নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি দিলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার কথাও বলেন তিনি।
একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘এই বুদ্ধিটা বিনা পয়সায় দিলাম।’
মোনাজাত করেছেন, আমিও দোয়া করছি
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা আবার বক্তব্য দিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জবাব দেন। বিরোধীদলীয় নেতা তাকে উদ্দেশ করে সংসদে দাঁড়িয়ে ‘মোনাজাত’ করেছেন—এ কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনিও বিরোধীদলীয় নেতার জন্য দোয়া করছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা আমার জন্য এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেছেন। আমিও দুই হাত তুলে রাব্বুল আলামিনের কাছে আমাদের বিরোধীদলীয় নেতার হায়াতে তায়্যেবা দান করুন, সবরে জামিল দান করুন; দোয়া করছি।’
এরপর মূল প্রসঙ্গে ফিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য থেকে তিনি বুঝেছেন, গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকবে, কিন্তু তাকে কোনও কমিটিতে রাখা হবে না। গাজী নজরুল ইসলামের সদস্যপদটা বহাল থাকলো, কিন্তু কমিটিতে রাখা যাবে না—এটাই বুঝলাম।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা চাইলে কমিটি থেকে গাজী নজরুলের নাম বাদ দেওয়া সম্ভব। ‘মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার সম্মানার্থে আমরা বাদ দিয়ে দেবো’, যোগ করেন তিনি।
নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপিল করেছিলাম
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে সংসদে তার সঙ্গে এ ধরনের কথোপকথন হওয়াটা স্বাভাবিক। তিনি ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার ক্ষেত্রে এ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য।
তিনি বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাই। আমি নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে আপিল করেছিলাম, উনি এটাকে এনডোর্স করেছেন। এ জন্য উনাকে মোবারকবাদ।’
পুনর্গঠিত কমিটিতে নেই গাজী নজরুল
এরপর সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আবার সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কমিটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবিত সদস্য তালিকা থেকে গাজী নজরুল ইসলামের নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে স্পিকার প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দেন। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে ঘোষণা করে স্পিকার বলেন, সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি পুনর্গঠিত হলো।
এর ফলে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকলেও সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটিতে তার সদস্যপদ থাকলো না।








