স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ দ্রুত পাস করা, র্যাবের জনবল-সম্পদ ও রেকর্ড সরাসরি এসআরবিতে হস্তান্তর, অভিযোগ তদন্তের কাঠামো এবং সদস্যদের আটক ও শাস্তির ক্ষমতা নিয়ে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি তুলেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। বিলের ওপর দেওয়া নোট অব ডিসেন্টে তারা বলেছেন, র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের আগে যথাযথ জাতীয় পরামর্শ ও শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে উত্থপিত বিলে এই আপত্তি জানানো হয়।
গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে উত্থপিত বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য। বিলটি যাচাই-বাছাই শেষে কমিটির প্রতিবেদনসহ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেন।
কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলের সাতটি আপত্তির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বিরোধী দলের সাতটি আপত্তি হলো-
বিরোধী দলের সাত আপত্তি
১. পরামর্শ ছাড়াই দ্রুত বিল পাস ঝুঁকিপূর্ণ
নোট অব ডিসেন্টে বলা হয়েছে, র্যাব বিলুপ্ত করা বিএনপির দীর্ঘদিনের অবস্থান। ২০১৪ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছে দলটি র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে তোলার সময়ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম র্যাব বিলুপ্তির আগের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও নতুন বাহিনী গঠনের আগে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বিরোধী সদস্যরা উল্লেখ করেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর এবং গুম কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও সতর্ক করেছে, যথাযথ নজরদারি ছাড়া এসআরবি র্যাবের নতুন নাম হয়ে উঠতে পারে।
বিলের ধারা ২৭(৩) অনুযায়ী র্যাবের জনবল, স্থাপনা, ক্ষমতা, রেকর্ড, সম্পত্তি, চুক্তি ও দায় সরাসরি এসআরবিতে যাবে। ফলে নাম পরিবর্তনের বাইরে বাহিনীর কাঠামো ও কার্যক্রমে কী পরিবর্তন আসছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তা না হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন বাহিনীকে র্যাবের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হতে পারে।
তাদের প্রস্তাব, বিলের ওপর কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার সময় বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট, প্রসিকিউটর, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে একাধিক পরামর্শ সভা করা।
২. র্যাবের রেকর্ড কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে
ধারা ২৭(৩) অনুযায়ী র্যাবের হিসাববই, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও দলিল এসআরবিতে যাবে। কিন্তু হস্তান্তরের আগে এসব নথি কীভাবে সংরক্ষণ, তালিকাভুক্ত ও নিরাপদ করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বিধান নেই।
বিরোধী সদস্যরা বলেন, গুমসহ গুরুতর অপরাধের বহু মামলায় র্যাবের পদায়ন ও বদলির আদেশ, ডিউটি রোস্টার, অভিযান ও গ্রেফতার রেকর্ড, হেফাজত রেজিস্টার, গাড়ি চলাচলের তথ্য, ওয়্যারলেস লগ, ইলেকট্রনিক রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ ও অস্ত্র ইস্যু রেজিস্টার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। রেকর্ড হস্তান্তরের সময় এসব নষ্ট, পরিবর্তন বা হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে চলমান মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের প্রস্তাব, ধারা ২৭-এ রেকর্ড সুরক্ষার পৃথক বিধান যুক্ত করতে হবে। হস্তান্তরের সময় প্রতিটি নথি ও আলামতের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নিতে হবে। কোনো রেকর্ড গোপন, পরিবর্তন, সরানো বা নষ্ট করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। আদালতের আদেশ ছাড়া সাবেক আটকস্থলের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না। আদালত, ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউটর ও আইনসম্মত তদন্ত দলকে প্রয়োজনীয় রেকর্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. এসআরবির বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা দরকার
বিলের ধারা ২৪-এ অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এর সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং সদস্য-সচিব হবেন এসআরবির পরিচালক (লিগ্যাল ও মিডিয়া)। বিরোধী সদস্যদের মতে, যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীর কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে অভিযোগ তদন্ত হলে স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তাদের আরও আপত্তি, কমিটির পূর্বঘোষণা ছাড়া ক্যাম্পে প্রবেশ, হাজতখানা পরিদর্শন, রেকর্ড সিলগালা বা আটক ব্যক্তি ও সদস্যদের সঙ্গে একান্তে কথা বলার ক্ষমতা স্পষ্ট নয়। অপরাধের আলামত পাওয়া গেলে তা ফৌজদারি তদন্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর বাধ্যবাধকতাও নেই। অভিযোগকারীকে ফল জানানো এবং তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়েও স্পষ্ট বিধান নেই।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন কমিটি গঠন করতে হবে। এতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছে। কমিটির সচিবালয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে রাখার পাশাপাশি এসআরবির স্থাপনায় পূর্বঘোষণা ছাড়া প্রবেশ, নথি পরীক্ষা ও আটক ব্যক্তির সঙ্গে একান্তে কথা বলার ক্ষমতা দিতে হবে।
৪. মামলা আদালতে যাওয়ার আগে এসআরবির কাজ কে দেখবে
ধারা ১২ থেকে ১৫-তে এসআরবিকে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ, গ্রেফতার ও ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তি ও জব্দ আলামত নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তরের কথা থাকলেও এসআরবির অভিযান সম্পর্কে জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার বা আদালতের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান নেই।
বিরোধী সদস্যরা বলেন, এসআরবিকে পুলিশের মতো ক্ষমতা দেওয়া হলে পুলিশের মতো নিয়মিত জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তাদের প্রস্তাব, এসআরবির প্রতিটি জেলায় মাসিক বিবরণী দিতে হবে। এতে গ্রেফতার ব্যক্তির নাম, সময়, স্থান, কারণ, থানায় হস্তান্তরের সময়, তল্লাশি ও জব্দের তথ্য এবং পরোয়ানার বিষয় উল্লেখ থাকবে। বিবরণীর অনুলিপি পুলিশ সুপার বা পুলিশ কমিশনার এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে হবে।
৫. এসআরবি কোথায় এবং কতক্ষণ কাউকে আটক রাখতে পারবে
বিলের ধারা ১৩-তে বেসামরিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘আটক’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও এর স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। ধারা ১৫(৪)-এ এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বেসামরিক ব্যক্তিকে কোথায় এবং কতক্ষণ রাখা যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট সময়সীমা নেই। ধারা ১৪-তে ‘অনতিবিলম্বে’ থানায় হস্তান্তরের কথা বলা হলেও এর নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
বিরোধী সদস্যরা বলেন, অতীতে র্যাবের অঘোষিত স্থাপনায় মানুষকে আটকে রাখার অভিযোগ ও হেফাজত রেজিস্টার না রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এসআরবির প্রতিটি দফতর, ক্যাম্প, হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে।
প্রতিটি হেফাজতের জন্য ক্রমিক নম্বরযুক্ত রেজিস্টার রাখতে হবে। সেখানে ব্যক্তির নাম, সময়, স্থান, আইনগত কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসার তথ্য এবং থানায় হস্তান্তরের সময় উল্লেখ করতে হবে। থানায় হস্তান্তরের সর্বোচ্চ সময়সীমাও আইনে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৬. প্রশিক্ষণ ছাড়া পুলিশি ক্ষমতা প্রয়োগ নয়
ধারা ২৫-এ সদস্যদের প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও প্রশিক্ষণের মেয়াদ, পাঠ্যক্রম ও পাসের মানদণ্ড পরে বিধিতে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ধারা ১৩-তে সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ওপরের কর্মকর্তাকে ফৌজদারি তদন্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী সদস্যদের মতে, বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনী থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের ফৌজদারি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন, গ্রেফতার, তল্লাশি, জব্দ, কেস ডায়েরি ও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
তাদের প্রস্তাব, প্রশিক্ষণ শেষ করে সনদ না পাওয়া পর্যন্ত কোনো সদস্যকে এই ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। পুলিশ ছাড়া অন্য বাহিনী থেকে আসা সদস্যদের জন্য কমপক্ষে দুই মাসের কনভার্সন কোর্স, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও পরবর্তী রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৭. বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকার করলে সদস্যের সুরক্ষা
ধারা ১৮ অনুযায়ী শৃঙ্খলাভঙ্গ বা পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সদস্যকে আটক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ কতদিন আটক রাখা যাবে, তা স্পষ্ট নয়। আবার ধারা ২২-এ কোয়ার্টার গার্ডে আটক, অতিরিক্ত ড্রিল, গার্ড ও ফ্যাটিগ ডিউটির মতো শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিরোধী সদস্যদের আশঙ্কা, বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকারকারী বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের তথ্য দেওয়া কোনো জুনিয়র সদস্যও কমান্ডের প্রতিকূলতার শিকার হতে পারেন। তাই আইনসম্মত আদেশ অমান্য এবং বেআইনি কাজে অংশ নিতে অস্বীকার করার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা জরুরি।
তাদের প্রস্তাব, ছয় মাসের মধ্যে অভিন্ন আচরণ ও শৃঙ্খলা বিধি প্রণয়ন করতে হবে। বেআইনি কাজের তথ্য দেওয়া বা তাতে অংশ নিতে অস্বীকারকারী সদস্যকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। এই সুরক্ষা পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার প্রতিবেদন ও বিদেশে দায়িত্ব পালনের সুযোগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নোট অব ডিসেন্টে এসব প্রস্তাবের পাশাপাশি এসআরবি গঠনের আগে আরও বিস্তৃত জাতীয় পরামর্শ এবং শক্তিশালী স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।









