শ্রমিকরাই জানেন না তাদের পরিবারের কেউ বা তিনি নিজে কর্মক্ষেত্রে নিহত বা আহত হলে কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ তাদের প্রাপ্য। আর শ্রম আইনে যে ক্ষতিপূরণের পরিমান নির্ধারণ রয়েছে, তা মোটেই যথার্থ নয়। টাকার অংকে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, সেটা নির্ধারনের ভিত্তি কী হবে, সেটাও জানা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকের জন্য কার্যকর ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে এক বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত গণশুনানিতে জুরিবোর্ডের সদস্যরা এসব কথা বলেন।
গণশুনানিতে শ্রমিকদের বক্তব্য শুনে জুরিবোর্ড শ্রম আইন পরিবর্তনের বাইরে ক্ষতিপূরণ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয় বলেই জানান।
গণশুনানিতে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী থেকে আগত বিভিন্ন ধরনের কারখানার শ্রমিকরা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। স্বজন হারিয়ে বা নিজেরা আহত হয়ে মামলা করেও কিভাবে বছরের পর বছর সমাধান হয়নি, সেসব বিষয় নিয়েও কথা বলেন শ্রমিকরা। তারা বলেন, তাদের দুর্ঘটনা কারখানাতেই বা কর্মক্ষেত্রেই ঘটেছে কিন্তু পরবর্তী সময়ে মালিকেরা তাদের কোনও খোঁজ রাখেন না। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও চুক্তিপত্র না থাকার কথাও তারা উল্লেখ করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান সুমন বলেন, শ্রমিকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মালিকপক্ষ থেকে এক ধরনের অবহেলা আছে, তারা কখনোই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছেন না। তাজরীন ও রানা প্লাজার ঘটনা পরপর ঘটায় ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কিছু পরিবর্তন এসেছে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে গার্মেন্টস সেক্টর যে ধরনের মনোযোগগ পায় অন্যান্য জায়গার শ্রমিকরা সেটুকুও পান না।
জুরি বোর্ডের সদস্য ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, অনুদানকে ক্ষতিপূরণ ভেবে ভুল করা যাবে না। আইনিভাবে ক্ষতিপূরণের যে উল্লেখ আছে, সেটা পরিবর্তন নিয়ে ভাবা জরুরি।
আরও পড়তে পারেন: রানা প্লাজা ধস : ক্ষতিপূরণের নামে থোক বরাদ্দ!
আইন শালিস কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান শ্রম আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গঠনের ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, একেকটা ঘটনা ঘটবে আর আদালতের শরণাপন্ন হয়ে ক্ষতিপূরণ আদায় করবে, সেটা সময়সাপেক্ষ এবং সবসময় সম্ভবও নয়। ফলে একটি সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গঠন জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, উচ্চ আদালত থেকে আমাদের একটি কমিটি করে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কী হবে, তা নির্দিষ্ট করতে বলা হলো। আমরা সবদিক বিবেচনায় সেটা করে দিলাম। সর্বনিম্ন ২০লাখ ৪০ হাজার টাকা হয় হিসাব করে। কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ দেবে কে? আমরা হিসাব করে জমা দিলাম ঠিকই কিন্তু এখনও বিষয়টি শুনানির অপেক্ষায় আছে। আমরা দ্রুত একটি রায় চাই।
সভাপতির বক্তব্যে সাবেক বিচারপতি আওলাদ আলী আইনের পরিবর্তন জরুরি উল্লেখ করে বলেন, এখন যা দেওয়া হচ্ছে, তা ক্ষতিপূরণ নয়, আর্থিক অনুদান। ক্ষতিপূরণ দিতে হলে এসেসমেন্ট করতে হবে এবং কিভাবে কাদের এসেসমেন্ট হবে, সেটা শ্রম আইনেই উল্লেখ থাকতে হবে।
শুনানি সঞ্চালনা করেন ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট ইদ্রিসুর রহমান, বারকত আলী, তাসলিমা আখতারসহ বিভিন্ন শ্রমিক ফেডাশেনের নেতারা।
/ইউআই/এমএনএইচ/








