২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। সাভারের রানাপ্লাজা ভবন ধসে পড়ে। মুহূর্তে প্রাণ যায় ওই ভবনের পাঁচটি গার্মেন্টের ১১৩৬ শ্রমিকের। এ ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলার চেষ্টা করা হলেও এটা যে ভবন মালিক রানাসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড, এর প্রমাণ রয়েছে।
ঘটনার আগের দিন মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল, ভবনে ফাটল দেখা গেছে। ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার শ্রমিকরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরও শ্রমিকদের জোর করে কারখানায় ঢোকানো হয়। ভবনের অবস্থা ভালো নয়, এটা জেনেই সেখানে দ্বিতীয়তলার ব্র্যাক ব্যাঙ্কের শাখা বন্ধ রাখা হয়েছিল।এতো কিছুর পরও তোয়াক্কা করেননি ভবনের মালিক সোহেল রানা ও গার্মেন্টস মালিকরা।
বেঁচে ফেরা শ্রমিক নাসিমা আক্তার বলেন, ‘ঝুঁকির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই শ্রমিকরা আশঙ্কার কথা বলাবলি করতেন। মঙ্গলবার ফাটলের কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে দুইজন আহত হন। এরপর বুধবার শ্রমিকরা কাজে আসবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার গার্মেন্টসের সুপার ভাইজার মোবাইল ফোনে সবাইকে বুধবার কাজে আসার জন্য বলেন। বুধবার সকালে গার্মেন্টসের সামনে আসলেও শ্রমিকদের অনেকেই কাজ না করে ফিরে যেতে চান। তখন মালিক বলেন, বিল্ডিং ঠিক আছে। এরপর আমরা পেটের দায়ে ভেতরে ঢুকতে বাধ্য হই।’
আরও পড়ুন:
রানা প্লাজার উদ্ধার কাজের সেই নায়কেরা
ঘটনার আগের দিন ২৩ এপ্রিল একুশে টেলিভিশনের সাভার প্রতিনিধি নাজমুল হুদার কাছে খবর আসে রানা প্লাজা ভবনে ফাটল দেখা গেছে। প্রতিবেদক সেখানে গিয়ে ফাটলের ভিডিও ধারণ করে মালিক রানার সঙ্গে কথা বলেন। এসময় রানা বলেন, ‘এ ধরনের ফাটলে ভবনের কোনও সমস্যা হবে না। কেবল কিছু পলেস্তরা খসে যাওয়া অংশ এটা, ফাটলও নয়।’
নাজমুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পরের দিন আমি ফলো আপ করতে যাই। সেদিন ছিল হরতাল। আমাকে সেখানে যেতে দেখে রানা তার সাঙ্গপাঙ্গদের বলে আমার গাড়ি পুড়িয়ে দিতে। হুমকি শুনে আমি রানা প্লাজার জায়গা ত্যাগ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে ভবনটি ধসে গেছে। আগের দিনই আমি নিউজ করেছি। এলাকার ইউএনও সেখানে উপস্থিত হয়ে পযবেক্ষণ করেছেন। তিনি এবং রানা দুজনেই একই সুরে কথা বলেছেন। বলেছেন, ভবনে কোনও ফাটল নেই। যদি তারা অবহেলা না করতেন তাহলে কতগুলো প্রাণ বেঁচে যেত।’
শ্রমিকদের অভিযোগ বিষয়ে নাজমুল বলেন, ‘ফাটল দেখা যাওয়ার বিষয়টি তারা আমাকে জানিয়েছেন। আরও জানিয়েছেন, শ্রমিকরা কাজ করতে চান না। কিন্তু কাজ না করলে চাকরি চলে যাবে। এমন অবস্থায় বাধ্য হয়ে তারা কাজ করছেন। এটা শুনেই ২৩ তারিখ আমি সেখানে যাই। কিন্তু কর্তাব্যক্তিদের সবাই আশ্বস্ত করলেন, সামান্য পলেস্তারা খসে পড়লে ভবনের কোনও ক্ষতি হয় না। তাদের কোনও রকম ভ্রুক্ষেপ আমি দেখতে পাইনি। বরং কেন বিষয়টি আমি আলোচনায় নিয়ে এসেছি এ নিয়ে তারা আমার ওপর বিরক্ত ছিলেন।’
ভবন ধসের পরদিন সাভার থানায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনে দুইটি মামলা হয়। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে। ঘটনার ২ বছর ১ মাস পর রানাসহ ৪২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে দুই মামলার চার্জশিট দেয় সিআইডি। সেই চার্জশিট গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আজও মামলার বিচার শুরু হয়নি। দুই মামলায় প্রধান আসামি রানাসহ সাতজন কারাগারে থাকলেও পলাতক ১২ জন ছাড়া বাকি সবাই জামিনে রয়েছেন।
/এইচকে/







