ইয়াবার ক্রেতা বেড়েছে: মাদকাসক্ত হচ্ছেন সচ্ছল শিক্ষিতরাও

উদিসা ইসলাম
২৬ জুন ২০১৬, ১৮:৩৯আপডেট : ২৬ জুন ২০১৬, ১৮:৪৯

ইয়াবা ‘আমার মেয়ে বিবিএ’র শিক্ষার্থী ছিল। বছর খানেক হলো ওকে কেমন যেন বিষণ্ন মনে হতো। কারণটা শুরুতে ধরতে পারিনি। ও ঘুমায় না। কম্পিউটারে বসে থাকতে দেখে ভেবেছি পড়ালেখা করছে ঠিকঠাক। কিন্তু যখন পরপর দুবছর সে পরীক্ষা দিতে ব্যর্থ হলো, তখন খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সে ভীষণ মাত্রায় ইয়াবাসক্ত। কান্নায় ভেঙে পড়ে রাশেদ সাহেব মেয়ের নেশা সম্পর্কে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন,আমার মেয়েটা চোখের সামনে মারা যাচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, চাকুরিজীবী এবং স্বচ্ছল পারিবারিক জীবনেও ঢুকে পড়েছে এই মাদক। সাংসারিক জীবনে এর প্রভাব পড়ছে, সেটা শুরুতেই আসক্তরা বুঝতে না পারায় ভাঙছে সংসার।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, শুরুতে যেকোনও মাদকের  প্রভাব বুঝতে না পারাটাই বড় সমস্যা। মাদকসেবীরা ভাবেন, দিব্যি কাজ করা যাচ্ছে, কিছু হচ্ছে না। কিন্তু যা হওয়ার তাতো ভেতরে ভেতরে ঘটছেই। ইয়াবাসেবীদের কারও কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর একটি নাম করা হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের সন্তানও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। সদ্য বিবাহিত সন্তান তার স্ত্রীকে নিয়েই ইয়াবা সেবন শুরু করে। শুরুর দিকে দুজনের বোঝাপড়ায় কোনও সমস্যা হয়নি। নিজ নিজ চাকরি শেষে সন্ধ্যায় একসঙ্গে বন্ধুদের নিয়ে ইয়াবা সেবন  করে বাসায় ফেরেন। এরপর একসময় শুরু হয় পরস্পরকে অবিশ্বাস আর অফিসে নিজেদের কাজের ছোটখাটো ভুল । এক পর্যায়ে চাকরি হারান ছেলেটি। বছর খানেক পর শারিরীক সমস্যা দেখা দিলে সব রাগ গিয়ে পড়ে বউয়ের ওপর। ততদিনে বউও আসক্ত। ভেঙে যায় সংসার।
মনোচিকিৎসক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, দীর্ঘদিনের আসক্ত ব্যক্তিরা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। স্মৃতিশক্তি কমে যায়, মানসিক নানা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়,অহেতুক রাগারাগি,ভাঙচুরের প্রবণতা বাড়ে। পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র বা পারিবারিক জীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষিত যারা মাদক নেন তারা সেটা গ্রহণের জন্য নিজেদের কাছে যুক্তি হাজির করেন। কিন্তু ইয়াবা শ্রুতি বিভ্রম থেকে শুরু করে অস্বাভাবিক সন্দেহ প্রবণতা প্রভৃতি উপসর্গ থেকে এক সময় জটিল মানসিক ব্যধিরও জন্ম দিতে পারে। এটা তারা আসক্ত অবস্থায় কখনোই বুঝতে চাইবেন না। সে কারণে প্রয়োজন কাউন্সিলিং।

গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় হাতের নাগালেই এখন পাওয়া যায় ইয়াবা। ইয়াবা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাতে খরচের টাকা বেশি পাওয়া ছেলেমেয়েরাই আসক্ত হয় বেশি। যে বিষয়টা একেবারেই সামনে আসেনা তাহলো- ডাক্তার, প্রকৌশলী ও তরুণ ব্যাংকার থেকে শুরু করে সৃজনশীল পেশায় জড়িত এমন অনেকেই তাদের কাছ থেকে নিয়মিত ইয়াবা নেন। কখনও নিজেরা স্পটে এসে নেন, কখনও হোম সার্ভিসের মাধ্যমে নিয়ে থাকেন। আগের তুলনায় অন্য যেকোনও মাদকের চেয়ে এখন ইয়াবার প্রতি আসক্তি বেশি বেড়েছে বলে জানান তারা।

সূত্র জানায়, রাজধানীতে সাধারণ বিক্রেতাদের টার্গেট দিনে অন্তত ৪০-৫০টি ট্যাবলেট বিক্রি। এরা যাদের কাছে বিক্রি করে তারা যাতে অন্য কারোর কাছে না যায় সে ব্যবস্থাও আছে। একেক ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে ১০-১২ জনের সেবক গ্রুপ থাকে। ইয়াবার চালান আটকানোয় পুলিশ যতটা পারদর্শী এর বিক্রেতাদের ধরার ক্ষেত্রে ততটা না উল্লেখ করে পুরানা পল্টন এলাকার বিক্রেতা সাত্তার বলেন, এই জিনিসটা বহন করা সহজ আবার নিয়মিত অন্য মাদক বিক্রেতারা এটা বিক্রি করে এমনও না। আমাদের কাছ থেকে একসঙ্গে কিনে নিয়ে গিয়ে যারা এলাকায় অলিতে গলিতে বিক্রি করছেন, তাদের খোঁজ পুলিশের কাছে নেই বলেই ধরা মুশকিল। 

এবিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিয়মিতই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের চালানসহ ধরা হচ্ছে। কিন্তু সমাজকে কুলষিত করছে যে জিনিস সেটা কেবল আইন দিয়ে রোধ সম্ভব না। এর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেটা কমিউনিটি পুলিসিং এর মাধ্যমে আমরা করছিও।

এপিএইচ/

আরও পড়ুন: 
সচিব পরিচয়ে ইয়াবা পাচার, ধরা খেলেন বিমানবন্দরে

এমপি-পুলিশ-সাংবাদিকও ইয়াবা ব্যবসায়ী!

 

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী