গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর সারাদেশে জঙ্গি সন্দেহে আটক হয়েছে ১৫৯ জন। আটকের সংখ্যা বিবেচনায় জঙ্গি ইস্যুতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে সাতক্ষীরা এবং সিলেট। দেখা যায় জুলাই মাসে সাতক্ষীরা থেকে জঙ্গি সন্দেহে আটক হয়েছে ৪৫ জন এবং সিলেট থেকে আটক হয়েছে ৩১ জন।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, এলাকাটি জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি বলে এখানে জঙ্গি তৎপরতা বেশি। অন্যদিকে সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা জানান, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।
জুলাইয়ের প্রথম দিন গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন ২২ জন সাধারণ মানুষ। যার মধ্যে ১৭ জনই ছিলেন বিদেশি। এই ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালায়। যার প্রেক্ষিতেই কল্যাণপুরে জঙ্গিদের একটি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপারেশন স্টর্ম-২৬ পরিচালনা করে, যেখানে নিহত হয় ৯ জঙ্গি।
সর্বশেষ জুলাই মাসে ছোট-বড় মোট ৮ টি হামলায় ৪ পুলিশসহ নিহত হয় ৩০ জন সাধারণ মানুষ। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় জুলাই মাসে সারাদেশে আটকের সংখ্যা ১৫৯ জন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, যেসব জেলায় জঙ্গিরা ধর্মান্ধকরণ প্রক্রিয়াটা পোক্ত করতে পেরেছে সেখানেই জঙ্গিদের রিক্রুটমেন্ট বেশি হচ্ছে। এসব জেলায় তারা একধরনের স্বাধীনতা উপভোগ করছে বলেই সেখানে তাদের সংখ্যাটা এভাবে বাড়ছে।
জঙ্গিবাদ রুখতে পুলিশের চলমান অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিবাদের যে মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ছে সেটি ঠেকাতে পরামর্শ দেন তিনি।
একমাসে সাতক্ষীরা থেকেই জঙ্গি সন্দেহে আটক হয়েছে ৪৫ জনকে, এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার এলাকাটি জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি ছিল। তাই এখানে জঙ্গিদের সংখ্যা বেশি হওয়াটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি এবং এটা চলমান থাকবে।
অন্যদিকে গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সিলেট থেকে জঙ্গি সন্দেহে আটক হয়েছে ৩১ জন। এ সংখ্যাটিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার জেলার তালিকাভুক্ত জঙ্গি আছে ১৮ জন। যার মধ্যে ৫ জনকে আগেই আটক করা হয়েছিল, তারা এখন কারাগারে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ১ জনকে আটক করা হয়েছে এবং বাকিরা পলাতক।
তিনি আরও জানান, জেলায় জঙ্গিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তারা মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন।
অন্যদিকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) রহমতুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারা ১ জন চিহ্নিত জঙ্গিকে ইতোমধ্যে আটক করতে সমর্থ হয়েছেন।
এদিকে, সাতক্ষীরা ও সিলেটের বাইরে এসব অভিযানে মানিকগঞ্জে ১১ জন, ঢাকায় ১০ জন, পাবনায় ৯ জন, খুলনায় ৮ জন, চট্টগ্রামে ১০ জন, নওগাঁয় ৬ জন, গাজীপুরে ৪ জন, কুমিল্লা, মাগুরা ও টাঙ্গাইলে ৩ জন করে আটক হয়েছে।
আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ২ জন করে জঙ্গি সন্দেহে আটক হয়েছে। বান্দরবান, নরসিংদী, রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জে আটক হয়েছে একজন করে।
এদের মধ্যে আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের ৭ জন, নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত-তাহরিরের ৩ জন, জামাত-শিবিরের ৩৪ জন, জেএমবির ৩২ জন এবং জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক হয়েছে আরও ৮৩ জন।
জঙ্গি হামলায় অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হওয়ায় ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গোপনে জঙ্গি তৎপরতা চলছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের ৯ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জুলাই মাসে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৩ জন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী এবং বাঘুতিয়া আলিম মাদ্রাসা, বিজুল হুদা মাদ্রাসা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, যশোর এমএম সরকারি কলেজ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কাজি সফিউদ্দিন দাখিল মাদ্রাসা, নওগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং রেটিনা কোচিং সেন্টারের একজন করে ছাত্র রয়েছেন। আর ১৪৫ জনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন-
জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা: র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ২
গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের সেই হামলার প্রথম দিকের ভিডিও
/এমএসএম/আপ-এফএস/







