আশুরা হচ্ছে মুসলিম বিশ্বে ত্যাগ ও শোকের দিন । হিজরির সাল অনুসারে ১০ মহরমকে বলা হয় আশুরা। ঘটনাবহুল এই দিনে বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত কারবালা প্রান্তরে মুয়াবিয়ার হাতে শহীদ হন হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন। তাঁর মৃত্যুর দিনটিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন ইমাম হোসেনের অনুসারী শিয়া সম্প্রদায়। বুধবার বাংলাদেশে এ দিনটি পালন করা হচ্ছে নানা আনুষ্ঠানিকতায়। এরই মধ্যে কারবালার দৃশ্যায়নের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিল।
রাজধানীতে আশুরা উপলক্ষে সবচেয়ে বড় আয়োজন ছিল পুরান ঢাকায় হোসাইনী দালান থেকে বের হওয়া তাজিয়া মিছিল। এছাড়াও রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বকশিবাজার, লালবাগ, পল্টন, মগবাজার থেকেও আশুরার মিছিল বের হয়। বুধবার সকাল দশটার দিকে পুরান ঢাকায় হোসাইনী দালান থেকে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হয় তাজিয়া মিছিল।
তাজিয়া মিছিলে দেখা যায় কারবালার ঘটনার শোকাবহ দৃশ্যায়ন। মিছিলে বুক চাপড়ে, মাতম করে শোক প্রকাশ করেন শিয়ারা। এবার পুলিশের পক্ষ থেকে ছুরি, চাকু দিয়ে শরীরে ক্ষত-বিক্ষত করে মাতম করতে নিষেধ করে। তাই মিছিলকারীরা পুলিশের নির্দেশও মেনেছেন আবার নিজেদের ক্ষত করতেও কার্পণ্য করেননি। এবার তারা ব্যবহার করেছেন ব্লেড। মিছিলের শুরুতেই দুটি কালো গম্ভুজ বহন করা হয় বিবি ফাতেমার স্মরণে। এছাড়াও মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন নিশান নিয়ে আসেন। যে যার মতো এই নিশান বহন করেন। মিছিলের মধ্যে একদল থাকেন যারা শোকের গান গাইতে থাকেন। হায় হোসেন, হায় হোসেন করে শোকের গানে গাওয়া হয় সমবেত কন্ঠে। মিছিলে দুইটি ঘোড়া থাকে, এর মধ্যে একটি রঙ নিয়ে রক্তের রূপ দেওয়া হয়। ইমাম হোসেন যখন কারবালায় যান তখন এক রকম থাকে, আবার যুদ্ধের শেষে রক্তে ভেসে ঘোড়া এই অবস্থান তুলে ধরা হয় এর মধ্য দিয়ে। মিছিলে তাজিয়া তৈরি করা হয় ইমাম হোসেন (রা.)-এর সমাধির আদলে। মিছিলে গায়ে রঙ লাগিয়ে কারাবালার সেই রক্তপাতের দৃশ্য তুলে ধরা হয়। এছাড়াও অনেকেই বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম করতে থাকেন।
জানা গেছে, মোগল আমল থেকেই এই অঞ্চলে তাজিয়া মিছিলের প্রচলন হয়। ১০৫২ হিজরি সনে হোসাইনী দালান নির্মিত হয়। হোসাইনী দালানে দশ দিন আশুরা পালিত হয় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ১০ মহররম আশুরার দিনে সকালে বিশাল তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। হাজারো মানুষ এই শোক মিছিলে ‘হায় হোসেন-হায় হোসেন’ মাতম তুলে অংশ নেয়।
এছাড়াও আশুরা উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। দেশে শিয়া সম্প্রদায় মহরম মাসের প্রথম দশদিন শোক স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করে। আশুরার দিনে তাজিয়া বের করা হয় শোকের আবহে। মূলত ইমাম হোসেন (রা.) এর সমাধির প্রতিকৃতি নিয়ে এই মিছিল হয়। আরবি‘তাজিয়া’ শব্দটি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করতে ব্যবহার করা হয়।
নারী, পুরুষের পাশাপাশি শিশু কিশোরদের অংশগ্রহণে তাজিয়া মিছিল শেষ হয় দুপুর দেড়টার দিকে। রাজধানির জিগাতলা সংলগ্ন লেকের পাশে এসে শেষ হয় তাজিয়া মিছিল। লেকের পাশে এসে নামাজ আদায় ও দোয়া পাঠ করেন মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা।
তাজিয়া মিছিলের মুল দায়িত্বে থাকে হোসাইনী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন। তাজিয়া মিছিল প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও মিছিলের সমন্বয়ক সাইয়েদ গোলাম মহসিন বলেন, কারবার শোককে ধারণ করে এ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মাতম করে শোক প্রকাশ করেন সবাই। সাধারণত মিছিলে বুক চাপড়ে, জিঞ্জির দিয়ে শরীরে আঘাত করে মাতম করা করা হয়, তবে এবার পুলিশের অনুরোধে নিরাপত্তা স্বার্থে জিঞ্জির দিয়ে শরীরে আঘাত করে মাতম করা হয়নি।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
/সিএ/টিএন/আপ-এসএনএইচ/








