যে কারণে সীমান্তের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া হয় না

জামাল উদ্দিন
১৭ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:৫১আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:৫৬

কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলছে বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত ফেলানীর লাশ

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) কর্তৃপক্ষ। ফ্ল্যাগ মিটিং ছাড়াও দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের মিটিংয়ে বিজিবিকে এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য  জানিয়ে থাকে বিএসএফ। যে কারণে সীমান্তের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা হয় না বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকে। তবে প্রত্যেকটি ঘটনারই জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয় বলে জানান বিজিবি কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরের পর বছর সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও প্রতিকার চেয়ে আসছে। কিন্তু সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। বিজিবি-বিএসএফ-এর শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলোতেও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি অনেকটা কমন এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন বৈঠকে বিভিন্ন সময়  ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেটা কার্যকর হচ্ছে না। উপরন্তু, শীর্ষ পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন চলার সময়েও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকে। প্রায় প্রতিটি বৈঠক চলার সময়েই সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রে’র কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে মারা গেছেন ২১ জন। আহত হয়েছেন ২৮ জন। অপহরণের শিকার হয়েছেন ১৯ জন। এছাড়া, অপহরণের পর বিজিবি’র মধ্যস্থতায় ফেরত এসেছেন ১৮ জন।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে ২৭ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৯ জন। অপহৃত হয়েছেন ১৮ জন। আর ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১১০৬ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী কোনও দেশ অন্য দেশের নাগরিককে হত্যা করতে পারে না। কেউ যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে তাকে গ্রেফতার করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। সীমান্তরক্ষীরা আত্মরক্ষার্থে ‘নন লেথাল ওয়েপন’ (প্রাণঘাতী নয়) অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এ ব্যাপারে বিএসএফ বার বার প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে প্রতিনিয়ত। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফ এর সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে কিশোরী ফেলানী নিহত হয়। এরপর থেকে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে জোরালো প্রতিবাদ শুরু হয়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সীমান্তে নিহতদের বেশিরভাগই যে গরুসহ অন্যান্য পণ্য চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিল না, এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। তাছাড়া, চোরাচালান একটি অপরাধ। সেই অপরাধের শাস্তির বিধানও আছে। এখনতো গরু চোরাচালান অনেকটা কমে গেছে। তারপরও সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা কমছে না কেন?’ তিনি বলেন, ‘মূলত সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারত তার প্রতিশ্রুতি রাখছে না। এজন্য জাতিসংঘ কিংবা অন্য কোনও তৃতীয় পক্ষের কাছে এর সমাধান চাইতে পারে বাংলাদেশ ।’

সীমান্তে বিএসএফ-এর বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিকার চাওয়া হচ্ছে না বলে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিজিবি’র মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবাদ কিংবা প্রতিকার চাওয়া হয় না- একথা ঠিক না। প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লোকজন ঘটনাস্থলে যান। বিএসএফ-এর কাছে মৌখিক ও লিখিত দু’ভাবেই আমরা জোরালো প্রতিবাদ করি। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি এবং কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেটার জানানোর অনুরোধ জানাই। প্রতিবাদলিপি যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওদের ওখানে যায়, সেখানেও কিন্তু এটা আলোচিত হয়। কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে সেগুলো বলা হয়ে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় যখন তাদের সঙ্গে ফ্ল্যাগ মিটিং করি, তখন তারা আমাদের জানিয়ে থাকেন যে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কি ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

বিজিবি’র ডিজি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের নয়াদিল্লিতে ডিজি পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত মে মাসে ঢাকায় ডিজি পর্যায়ের শীর্ষ সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ দু’টি সম্মেলনে গরু পাচার ও সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।’ আমরা বলেছি, ‘সীমান্তে ৯৫ ভাগ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ গরু পাচার। তাই গরু পাচার বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে গরু ভারতে যায় না। ভারত থেকেই বাংলাদেশে গরু আসে। সেজন্য গরু পাচার তাদেরই বন্ধ করতে হবে। আর পাচার হওয়া সব গরু সীমান্তে উৎপাদন হয় না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে সেগুলো সীমান্তে আসে। তাই অন্য জায়গা থেকে যাতে সীমান্তের কাছাকাছি গরু আসতে না পারে, সেজন্য এগুলোর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের দায়িত্ব নিতে হবে।’

বিজিবি’র ডিজি আরও বলেন,‘গত মে মাসে ঢাকায় যে সীমান্ত সম্মেলন হয়েছিল সেখানে আমরা নিজেরা ঠিক করেছি যে, কোনও হত্যাকাণ্ড হলে আমরা দু’পক্ষই ঘটনাস্থলে সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করবো। এরপর থেকে যৌথভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে যদি মনে হয় যে, হত্যাকাণ্ডটি এড়ানো যেতো, কিংবা সঠিক হয়নি এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়। আগে প্রতিটি ঘটনায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছে  বলে বিএসএফ  জানাতো।  গত  মে  মাস  থেকে  আমরা  ঘটনাস্থলে সরেজমিনের নিয়ম চালু  করেছি।

/জেইউ/ এপিএইচ/

আরও পড়ুন:
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা!

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম