বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ছে কওমি অঙ্গনে

চৌধুরী আকবর হোসেন
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০২:০২আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০২:০৭

 

কওমি মাদ্রাসায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দেয়ালিকা মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার দিনে দিনে বাড়ছে কওমি মাদ্রাসাসহ কওমিপন্থী সংগঠনগুলোতে। কয়েকবছর আগেও মাদ্রাসাগুলোয় বাংলা ভাষার ইতিহাসের চর্চা সীমিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় পাঠদান করা হতো। সেই ধারাকে ভেঙে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ছে কওমি অঙ্গনে। রাজধানীতে অবস্থিত কওমি মাদ্রাসাগুলোর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

কিছু দিন আগেও বাংলা ভাষাকে ‘হীন’ চোখে দেখা হতো কওমি অঙ্গনে। শহীদ দিবসেও ছুটি ছিল না। কওমি মাদ্রাসাগুলোয় কোনও আয়োজন ছিল না। তবে ধীরে-ধীরে বদলে যাচ্ছে ধ্যান-ধারণা। শুধু ছুটিই নয়, অনেক মাদ্রাসায় আয়োজিত হচ্ছে জাতীয় দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

অন্যান্য জাতীয় দিবসের পাশাপাশি শহীদ দিবসে কওমি মাদ্রাসা চলে বিশেষ অনুষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় ভাষা শহীদদের জন্য মঙ্গলবার রাজধানীর বড়কাটারা মাদরাসায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ দিন সকাল ১১টায় মাদ্রাসাটির হলরুমে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি সাইফুল ইসলাম।

এ আয়োজন প্রসঙ্গে বড়কাটারা মাদ্রাসার মুতাওয়াল্লি ও সদরে মুহতামিম মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী বলেন, ‘১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার বুকের তাজা রক্ত দিয়েছেন। মাতৃভাষা খোদার সেরা দান। মাতৃভাষায় আমরা কথা বলব, হাসব, কাঁদব; এটা আমাদের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। ভাষা শহীদদের জন্য দোয়া করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এটা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার উৎকৃষ্ট পন্থা।’

কওমি মাদ্রাসায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দেয়ালিকা

কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের দেয়ালিক পত্রিকা প্রকাশ দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আরবি, উর্দুতে প্রকাশ হতো এসব দেয়ালিকা। তবে এখন একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়াও সারা বছর বাংলায় প্রকাশের হার বাড়ছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা  নানা রঙের বিভিন্ন ছবি এঁকে তুলে ধরছেন এসব দেয়ালিকায়। মঙ্গলবার রাজধানীর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসায় গিয়ে দেয়ালিকা দেখা গেছে। এরমধ্যে কয়েকটি মাদ্রাসায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে বেশ কয়েকটি দেয়ালিকা প্রকাশ করেছে। এছাড়া, কয়েকটি মাদ্রাসায় একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ছিল আলোচনা অনুষ্ঠান।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা, মিরপুরের আজরাবাদ মাদ্রাসা, খাদিমুল উলুম মাদ্রাসা, মালিবাগ জামিয়া শরইয়্যা মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন মাদ্রাসায় দেয়ালিকা প্রকাশিত হচ্ছে বাংলায়। ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও এসব দেয়ালিকায় প্রকাশিত হচ্ছে গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া ও কবিতা। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই চাঁদা তুলে এসব দেয়ালিকা প্রকাশ করছেন।  

উল্লেখ্য, ব্রিটিশদের ইংরেজ শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিহত করে ইসলামধর্ম ভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৮৬৬ সালে মাওলানা কাসেম নানুতবীর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদ্রাসাটিই কওমি মাদ্রাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ব্রিটিশদের শাসন আমল এবং তার আগে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ফার্সি ভাষার প্রচলন ছিল। এরপর  উর্দুর প্রচলনও বাড়ে। কোরআন, হাদিসের ব্যাখ্যা সংবলিত গ্রন্থগুলো আরবিতে লিখিত হলেও এ অঞ্চলে ফার্সিতে অনূদিত হয়। ধীরে-ধীরে আরবি-ফার্সি ভাষায় লেখা বইগুলোর ব্যাখ্যা  উর্দুতে প্রকাশিত হতে থাকে। ফলে কওমি  মাদ্রাসাগুলো ফার্সি-উর্দু নির্ভর হয়ে পড়ে। ধর্মীয় বইগুলো আরবিতে রচিত হলেও পড়ানো হতো এই দুই ভাষাতেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দীর্ঘদিন যাবত এই রীতি মেনে চলে কওমি মাদ্রাসাগুলো।  সম্প্রতি এই রীতির বাইরে যাওয়ার জন্য লড়ছেন তরুণরা। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসাই এই উদ্যোগে আগ্রহী করে তুলেছে। গণমাধ্যমেও বাড়ছে কওমি ঘরানার ব্যক্তিদের পদচারণা।

কওমি মাদ্রাসায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দেয়ালিকা

মাদ্রাসার ছাত্রদের ভাষা ব্যবহার ও লেখার বিষয়ে কর্মশালাও করছে বিভিন্ন সংগঠন। কওমি মাদ্রাসা বোর্ডও  শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষার ব্যবহার, বানানরীতি নিয়ে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে এ আয়োজন করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম। সংগঠনটির সভাপতি  মুফতি এনায়েতুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কওমি অঙ্গনে বাংলার চর্চা আগেও ছিল। তবে গণমাধ্যমে কওমি অঙ্গন গুরুত্ব পেত না বলে আলোচনা হতো না। এখন গণমাধ্যমে কওমি অঙ্গনের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে বলে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি পরিবর্তনের। বিভিন্ন সময়ে ভাষার ব্যবহার, বানানরীতি নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করছি।’

কওমি মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করেছেন তারেক আজিজ। কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘ সময়। বর্তমানে দ্য সুলতান নামের একটি অনলাইন ম্যাগাজিনের হেড অব ক্রেয়েটিভ হিসেবে কাজ করছেন। মাদ্রাসার ছাত্রদের বাংলাচর্চা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটছে। তরুণরা নিজের দেশ, ভাষা নিয়ে ভাবছে। অনেকদিন ধরেই কওমি অঙ্গন পিছিয়ে ছিল নিজের সংস্কৃতি চর্চায়। এখন অনেকেই সাহিত্যচর্চা করছেন।’ আর পিছিয়ে থাকার সময় নেই বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

 আরও পড়ুন: ভাষার রাজনীতিতে পিছিয়ে বাংলা?

 

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
সান মারিনোর বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ 
সান মারিনোর বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ 
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী