এবছর বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম অনুসঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা পেয়েছে নতুন মাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ায় সরকারিভাবেও এবার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।সরকারি উদ্যোগে সারাদেশে বর্ষবরণের আয়োজনেও গুরুত্ব পাচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। শুধুমাত্র ইউনেস্কোর স্বীকৃতির কারণেই নয়, জঙ্গিবাদ ও মৌলবোদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রা ভিন্ন রকমের গুরত্ব বহন করে বলে মত দিয়েছেন এই শোভাযাত্রার আয়োজনের সঙ্গে জড়িতরা।
২০১৬ সালের নভেম্বরে ইউনেস্কো রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিয়েবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউমিনিটি’র তালিকায় বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাংলা নতুন বছরকে বরণ করতে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে থাকে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির সমন্বয়ক ও উপউপাচার্য অধ্যাপক মো. আকতারুজ্জামান বলেন, ‘এ বছরের আয়োজন একটু ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। কারণ ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশে বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম অনুসঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ বছর ধরে শোভাযাত্রা বের করে আসছে চারুকলা বিভাগ, যা এখন সারাদেশে প্রসারিত হয়েছে।’
অধ্যাপক মো. আকতারুজ্জামান বলেন,‘এ বছর আমরা যে আয়োজন করছি,সেটি আরও বেশি ভিন্নমাত্রা পাবে। সকল মানুষের অংশগ্রহণে সর্বজনীন একটি রূপ প্রকাশ পাবে।’
আয়োজন প্রসঙ্গে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘আয়োজনে প্রতি বছর ভিন্ন রূপ ধারণ করে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রূপ প্রকাশ পায়। এ বছর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মঙ্গল শোভাযাত্রায় তুলে ধরা হবে। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন প্রতিকৃতির মধ্যে বড় সূর্যের প্রতিকৃতি থাকবে। সূর্যের পেছনের অংশে থাকবে কালো রঙ। কালো রঙ-এর মাধ্যমে জঙ্গিবাদের অন্ধকার রূপকে তুলে ধরা হচ্ছে। জঙ্গিবাদ মানে অন্ধকার। জঙ্গিবাদ অন্ধকারে নিতে চায়। সেই অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফিরতে সূর্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে। এ আহ্বান থাকবে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। একই রকম ছোট ছোট অনেক সূর্য থাকবে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে। এ বছর মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান থাকবে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের অংশ -আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নববর্ষ বরণের মূল অনুষ্ঠান মঙ্গল শোভাযাত্রা। হাজার হাজার মানুষ এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এদিন উৎসবের ক্যাম্পাসে পরিণত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ আসেন। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অপশক্তির বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ হয়, সেখানে তাদের অংশগ্রহণ থাকে। এবার সেই অপশক্তির বিরূদ্ধে প্রতিবাদের এবং আলোর দিকে আহ্বানে শোভাযাত্রা হবে।’
এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বাঙালিরা পহেলা বৈশাখ পালন করে আসছে আবহমান কাল ধরে। তবে সময়ের বিবর্তনে পহেলা বৈশাখের ধরনধারণ অনেক পাল্টেছে। এক সময় এটি শুধুই উৎসব ছিল, সেখানে অর্থনৈতিক একটা বিষয় ছিল। হালখাতা করা হতো, মেলা বসতো সেগুলো গুরুত্ব পেত। একটা সময় দেখা গেছে, আমাদের স্বাধীনতার যে আকাঙ্ক্ষা ও বাসনা, সেটি পহেলা বৈশাখ ধারণ করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আমরা দেখিছি,যেখানেই সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশে ছোবল মারার চেষ্টা করেছে, তখন পহেলা বৈশাখ প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রাও একই চরিত্র ধারণ করে দিন দিন বিকশিত হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার সাজসজ্জায় দেখা যাবে, বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের চেহারা দেখেছি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় দেখেছি, স্বৈরাচারকে চিহ্নিত করে তার প্রতি ঘৃণা জানানো হয়েছে। আজও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির প্রতি ঘৃণা জানিয়ে সকলের মঙ্গল কামনা করে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়।’
আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘ইদানিং লক্ষ্য করছি যে, কিছু কিছু সাম্প্রদায়িক শক্তি নানাভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সমালোচনা করছে। তারা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বন্ধ করার পাঁয়তারা করছে। পহেলা বৈশাখের এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে কোনও রকম ধর্মের সঙ্গে সংঘাত নেই। এটি একেবারেই সাংস্কৃতিক বিষয়। এখানে কোনও উপাসনা করা হয় না। কোনও পূজা অনুষ্ঠিত হয় না।’
আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘এবার পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিপুল উদ্দীপনার মধ্যে পালিত হবে। পহেলা বৈশাখের নানা উদ্যোগ কেবল সরকারের নয়। সাধারণ মানুষও নানাভাবে উদযাপন করছে। শুধু ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ নয়, সারাদেশে নানাভাবে পালিত হয়।’
এদিকে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পালিত হবে। ইউনেস্কোর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে। দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় জাঁকজমক পূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করবে। বিভাগীয় শহর,জেলা শহর ও সকল উপজেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনসহ আলোচনা সভা ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করবে স্থানীয় প্রশাসন। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করবে। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউণ্ডেশন এবং বাংলা একাডেমি ও বিসিক ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার আয়োজন করবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজনসহ মঙ্গল শোভাযাত্রাকে গুরুত্ব সহকারে উদযাপনসহবহির্বিশ্বে প্রচার করবে ।
/সিএ /এপিএইচ/







