কারখানায় দুর্ঘটনা: শ্রমিকের সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায় না কেন?

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:৪৪, এপ্রিল ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৮, এপ্রিল ২৪, ২০১৮

রানা প্লাজাকারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধসসহ যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটলে কতজন শ্রমিক কাজে নিয়োজিত ছিল, সে বিষয়ে প্রথমেই মুখ খোলে না মালিকপক্ষ। ২০১২ ও ২০১৩ সালে পর পর তাজরিন ও রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় তালিকা তৈরির কাজ করছে—এমন দাবি করলেও অনেক কারখানা আছে, যেগুলো এখনও এর আওতায় আসেনি। আর শ্রমিক নেতারা বলেছেন, দুর্ঘটনাকবলিত শ্রমিকদের দায়দায়িত্ব এড়ানোর জন্য শুরুতেই সংখ্যাটাকে আড়াল করা হয়।

২০১২ সালে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের ওই পোশাক কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহত হন প্রায় ১১২ জন। আহত হন আরও কয়েকশ’ শ্রমিক। কিন্তু ঠিক কতজন শ্রমিক সেই মুহূর্তে কর্মরত ছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ থেকে বলা হয়নি।
পরবর্তীতে স্বজনদের অভিযোগ এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় জানা গিয়েছিল সম্ভাব্য তালিকা। শুরু থেকেই শ্রমিকদের তালিকা চাইলে মালিকপক্ষ থেকে বলা হয়, রেজিস্টার খাতা পুড়ে গেছে এবং তাদের ঢাকার হেড অফিসেও তেমন কোনও তালিকা নেই।

রানা প্লাজা ধসের পর এক বছর ধরে সারাদেশের পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন করে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর একটি তালিকা করে। তাদের মতে, পোশাক শিল্পে ২১ লাখ ৩০ হাজার ১৫৪ জন শ্রমিক কাজ করেন। এরমধ্যে নারী ১২ লাখ ২০ হাজার ৪৭৯ এবং পুরুষ নয় লাখ ১৬ হাজার ১৮২ জন। কিন্তু এরপরও একাধিক কারখানায় আগুনের ঘটনায় সে সময় কতজন শ্রমিক সেখানে কাজ করছিল, তার সঠিক সংখ্যা শুরুতেই জানা সম্ভব হয়নি।

শ্রমিক নেতা ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু মনে করেন—‘মালিকরা চালাকি করে নিজেদের স্বার্থে যখন প্রয়োজন হয়, শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। আবার যখন তাদের দরকার হয়, মুহূর্তে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যায়। এটা একটা বাস্তবতা। আরেকটি বাস্তবতা হলো, কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা কেবল মালিক ও কর্মকর্তারাই জানেন। কিন্তু বেতন নিয়ে অনিয়ম থাকায় কত শ্রমিক আছে, তারা বাইরে সেটা বলে না। আবার কোনও শ্রমিক যদি কারখানায় কয়েক মিনিট দেরিতে ঢোকেন, তবে সেদিনের জন্য তার হাজিরা খাতায় নাম তোলা হবে না। কারও সঙ্গে কোনও ব্যক্তিগত রেষারেষি হলেও হাজিরা খাতায় তার প্রভাব পড়ে। ফলে আপনি হাজির আছেন, কিন্তু উপস্থিতি খাতায় আপনার অস্তিত্ব নেই। তখন আপনি কীভাবে বলবেন ওই কারখানায় কতজন শ্রমিক ছিল।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতা জলি তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের তালিকা নিয়ে গরমিল করে ফেলে। শ্রমিকরাও সঠিক সংখ্যা বলতে পারেন না। নানা সময়ে আমরা এটা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ এটা করতে পারবে না।’

অফিসিয়ালি কাজটি করা সম্ভব কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অফিসের কাগজেই তো গড়বড় করে ফেলে সবসময়। বিজিএমইএ চাইলে পারতো, কিন্তু তারাও করবে না। তারা সব ঘটনায় মালিকদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত।’

আগুনে পুড়ে যাওয়া তাজরীন গার্মেন্টসগার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির তাসলিমা আক্তার কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব কারখানাতেই শ্রমিকদের ডাটাবেজ থাকার কথা। বেতনের কাগজের জন্যও তাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা লাগে। কিন্তু এটি কেন জানি উন্মুক্ত করা হয় না। রানা প্লাজা ধসের পরপরই বলা হয়ছিল এটি করা হবে। প্রত্যেক ঘটনায় বলা হয়, ঘটনার শিকার শ্রমিকের সংখ্যা কতজন জানি না। এটা দায়িত্ব অস্বীকার করার জন্য বলা হয়। বিজিএমইএ একটা কেন্দ্রীয় তালিকা তৈরির কথা বলেছিল, কিন্তু আমরা পরবর্তীতে এ নিয়ে তাদের কোনও উদ্যোগ দেখিনি। সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে মালিকপক্ষকে দিয়ে এটা করাতে বাধ্য করতে হবে। কতজন মানুষ মারা গেলো, এ নিয়ে জবাবদিহি করা এবং আড়াল না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে, ৩০ লাখ শ্রমিকের তালিকা করা হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে অনেক কারখানার হেড অফিস ছিল না। ফলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে, তালিকা ধ্বংস হয়ে গেলে, নতুন করে তালিকা পাওয়া কষ্টকর হতো। এখন আর সেই সমস্যা হবে না। কেননা, আমরা এখন কোনও কারখানায় কতজন শ্রমিক আছে, সেগুলো তালিকাভুক্তির কাজ করছি।’

 

/এপিএইচ/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ