জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন এবং ব্লগার নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় হত্যাকাণ্ডেরও তিন বছর হয়ে গেলেও আদালতে চার্জশিট দিতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। জানা যায়, প্রকাশক দীপনের হত্যাকারীরা সবাই চিহ্নিত হয়েছে। গ্রেফতারের পর এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ছয় জঙ্গি। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে একজন। কিন্তু তদন্ত শেষ হলেও চার্জশিট দেয়নি পুলিশ। এদিকে, ব্লগার নিলয় হত্যাকাণ্ডেরও তিন বছর পার হয়েছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে দুইজন। কিন্তু এখনও কোনও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। এই দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার্জশিট দিতে দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে তদন্তের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতক আসামিদের খুঁজে না পাওয়ার জন্যই দেরি হচ্ছে। তাছাড়া কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও একটা ব্যাপার।
দীপন হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার নিজ কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন। হত্যাকাণ্ডের দু’দিন পর ওই বছরই ২ নভেম্বর তার স্ত্রী ডাক্তার রাজিয়া রহমান বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। জানা যায়, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ও মুক্তমনা লেখক হিসেবে পরিচিত অভিজিৎ রায়ের একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছিল দীপনের মালিকানাধীন জাগৃতি প্রকাশনী থেকে। সেই কারণেই অভিজিতের খুনিরা তাকেও হত্যা করে। প্রসঙ্গত, এর আগে একই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিতকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
আদালত সূত্র জানায়, দীপন হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে মামলার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, যে জঙ্গি সংগঠন এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার চেষ্টা করেছে সেই জঙ্গি সংগঠন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দীপন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের একজন শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদী-১ ওরফে মুকুল রানা ২০১৬ সালের ১৯ জুন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর দীপন হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার দিন ধার্য রয়েছে।
জানা যায়, দীপন হত্যাকাণ্ডের পর দায়ের হওয়া মামলাটি প্রথমে শাহবাগ থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর ফজলুর রহমান মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘তদন্ত শেষ পর্যায়ে। আমরা চার্জশিট দিয়ে দেবো। আগামী মাসেই (সেপ্টেম্বরে) দিয়ে দিব আশা করি। কাজ চলছে।’
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ফজলুর রহমান আরও বলেন, ‘দীপন হত্যা মামলায় সাতজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সবাই কারাগারে আছে। তারমধ্যে ছয়জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখনও পাঁচ-ছয়জন পলাতক আছে। পলাতকদের দু’একজনকে ধরার জন্যই অপেক্ষা করছি। কিন্তু পলাতকদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারছি না। যে কারণে চার্জশিট দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। পলাতক দু’তিনজনের ঠিকানা পাওয়া গেছে। ধরতে না পারলেও তাদের নাম-ঠিকানা দিয়ে চার্জশিট দিয়ে দেবো।’
ব্লগার নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর রোডের ১৬৭ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলার ভাড়া বাসায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয়কে। হত্যাকাণ্ডের কয়েকঘণ্টা পর দায় স্বীকার করে আনসার আল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরপর দু’টি ইমেইল পাঠায়। হত্যাকাণ্ডের পর নিলয়ের স্ত্রী আশামনি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা চারজনকে আসামি করে খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর প্রথমে খিলগাঁও থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে এ মামলাটিরও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবির ইন্সপেক্টর বাহাউদ্দিন ফারুকীকে।
আদালত সূত্র জানায়, নিলয় হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সর্বশেষ দিন ধার্য ছিল গত ১৪ আগস্ট। কিন্তু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন ফারুকী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। এজন্য ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আবদুল্লাহ আল মাসুদ এই মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন।
নিলয় হত্যা মামলার তদন্ত কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর বাহাউদ্দিন ফারুকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) বেশ কিছু সদস্য পলাতক রয়েছে। আমরা তো তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাই। কিন্তু পলাতকদের না ধরা পর্যন্ত কি চার্জশিট দেওয়া ঠিক হবে?’
ইন্সপেক্টর ফারুকী আরও বলেন, ‘নিলয় হত্যা মামলায় ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কয়েকজন সম্ভবত জামিনেও আছে। দু’জন ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। শিগগির চার্জশিট দেওয়ার জন্য কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ চার্জশিট দেওয়া হবে তা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’








