রাজাকারদের তালিকা চেয়ে মাঠ প্রশাসনে পাঠানো চিঠির সাড়া মিলছে না

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ০৭:৪৮, অক্টোবর ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৭, অক্টোবর ০২, ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতন-ভাতাভোগী রাজাকারদের তালিকা চেয়ে মাঠ প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠির কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছে না। মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ৪ মাস আগে জেলা প্রশাসকদের কাছে এ চিঠি পাঠানো হলেও হাতেগোনা কয়েকটি জেলা থেকে জবাব এসেছে।
অবশ্য তালিকা চেয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। প্রথম চিঠিতে জেলা প্রশাসকদের তালিকা যথাযথভাবে সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরের চিঠিতে তালিকা সংরক্ষণের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ে এক কপি পাঠানোর কথা বলা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির তৃতীয় বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতন-ভাতা নেওয়া রাজাকারদের তালিকা জেলা প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২১ মে সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়। এতে রাজাকারদের তালিকা যথাযথভাবে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও চিঠি দেওয়া হয়।
এতে সাড়া না মেলায় পরে ২৮ আগস্ট তাগিদ দিয়ে আবারও চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে আগের স্মারক উল্লেখ করে বলা হয়, রাজাকারদের তালিকা যথাযথভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি এক কপি মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হলো। তবে এরও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।
চিঠি দুটো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রথম চিঠিতে কেবল তালিকা ‘যথাযথভাবে সংরক্ষণ’ করতে বলা হয়েছে। এখানে পাঠানোর বিষয়ে কোনও নির্দেশনা নেই। দ্বিতীয় চিঠিতে তালিকার একটি করে কপি পাঠাতে বলা হয়েছে। তবে চিঠি দুটোর কোনোটিতেই তালিকা পাঠানোর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি।
এদিকে, দ্বিতীয় চিঠি পাঠানোর তিন দিন আগে ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে তালিকা সংগ্রহের অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়। ওই বৈঠকে কোনও কোনও সদস্যের নির্বাচনি এলাকার জেলা প্রশাসনে এ ধরনের কোনও চিঠি যায়নি বলেও অভিযোগ ওঠে।
বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছেন। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা পাওয়া যাবে। তবে এখন পর্যন্ত এ তালিকা আসেনি বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
গত সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং বেতন-ভাতা প্রদানকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে রক্ষিত তালিকা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় ইতোমধ্যে তাগিদপত্রও দেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, মাগুরা জেলা থেকে জবাব পাওয়া গেছে বলেও সোমবারের বৈঠকে জানানো হয়। সর্বশেষ অগ্রগতি বিষয়ক এই প্রতিবেদন সোমবারের বৈঠকে উত্থাপন করা হলেও আরও সপ্তাহখানেক আগে এটি তৈরি করা। এরপর আরও দুই-একটি জেলা থেকে জবাব এসেছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বাগেরগাট জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের কাছে জানতে চাইলে তিনি তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে জানান। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা উপজেলা পর্যায় থেকে তালিকা সংগ্রহ করছি। এটা সম্পন্ন হলে তা সমন্বয় করে পাঠানো হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিভাগের একজন জেলা প্রশাসক বলেন, প্রথম চিঠির অস্পষ্টতার জন্য তারা তালিকা পাঠানোর তাগিদ অনুভব করেননি। দ্বিতীয় চিঠিতে এটা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের চিঠি পাঠানোর বিষয়ে সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। এজন্য যাতে ভুলভ্রান্তি না হয় জেন্য যাচাই করে আস্তে-ধীরে জবাব পাঠাবেন।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম আরিফ-উর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাড়া মিলছে না, সেটা সত্য নয়। আমরা চিঠির রেসপন্স পাচ্ছি। তবে, স্লো গতিতে জবাব আসছে। আর একবারেও তো পাওয়া যাবে না। কিছুটা সময় তো লাগবেই।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা এখনও আমাদের হাতে আসেনি। এটা নিয়ে কাজ চলছে বলে তারা আমাদের জানিয়েছে।’
সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এপ্রিল মাসে সুপারিশ করলেও জেলা প্রশাসনে চিঠি গেছে কিছুদিন আগে। প্রত্যাশিতভাবে না হলেও আস্তে আস্তে চিঠির জবাব আসছে বলে মন্ত্রণালয় আমাদের জানানো হয়েছে।’
তিনি নিজেও দ্রুত তালিকা সংগ্রহের তাগিদ দিয়েছেন জানিয়ে বলেন, সংসদীয় কমিটিও জেলা প্রশাসনকে তাগাদা দিয়ে পৃথক চিঠি পাঠানোর চিন্তা করছে।
প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গত দশম সংসদের এক প্রশ্নোত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলসামসের তালিকা প্রকাশের কথা বলেন। এরপরও তিনি সংসদের বাইরে-ভেতরে একাধিকবার একই কথা বলেন। গত আগস্টে মেহেরপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তালিকা প্রকাশ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। এই তালিকা তৈরির জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ