রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্যরা উপহার জমা দিতে চান না তোশাখানায়

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ১০:০০, জানুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৩, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

তোশাখানা জাদুঘর

নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় বেশি মূল্যমানের কোনও উপহার পেলে তা তোশাখানায় জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর বিধানটি প্রযোজ্য হবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সব সরকারি কর্মকর্তার ওপর। ঐতিহাসিক মূল্য আছে এমন উপহার পেলে বিধানটি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাদের পাওয়া উপহারগুলো তোশাখানায় জমা দিলেও সেই তালিকায় অন্যান্য মন্ত্রী-এমপি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম নেই বললেই চলে। তোশাখানা জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্যমতে, বর্তমান ও বিগত সময়ের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে তাদের উপহার তোশাখানায় জমা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু, তাদের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করছেন না মন্ত্রী, এমপি ও সরকারি কর্মকর্তারা।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাইরে সর্বশেষ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার উপহারসামগ্রী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে তোশাখানা জাদুঘরে জমা দিয়েছেন। তোশাখানা জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর জমা দেওয়া উপহারগুলো মূল্যায়নের কাজ চলছে। এছাড়া বিগত সময়ে তোশাখানায় উপহার জমা দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের নাম।

মন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন সময়ে পাওয়া উপহার তোশাখানায় জমা দেওয়ার প্রসঙ্গে নসরুল হামিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তো বিভিন্ন দেশে সফরে যাই। অন্য দেশের প্রতিনিধিরা আসেন। তাদের কাছ থেকে উপহার পেয়ে থাকি। আমি রেজিস্ট্রার মেনটেইন করে স্বচ্ছতার সঙ্গে সেগুলো তোশাখানায় জমা দিয়েছি।’

তার মন্তব্য, ‘অন্যরা এগুলোকে নিজের সম্পদ মনে করেন। তারা জমা দেন না। তাদের লজ্জা হওয়া উচিত।’

রাষ্ট্রের আইন না মানার প্রবণতা থাকার কারণেই সরকারের এমপি, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় উপহার পেলেও তা তোশাখানায় জমা দেন না বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে আইন নীতিমালার লঙ্ঘন একটা স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, যারা এই নীতিমালা, আইন তৈরি করেন, মেনে চলার অঙ্গীকার করেন, তারাই সেটা লঙ্ঘন করেন। এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ হওয়া অপরিহার্য বলে আমরা মনে করছি।’

একই কথা বলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন,‘ আমাদের দায়িত্বশীলরা বিভিন্ন সময়ে উপহার পেয়ে থাকেন। আর তারা ভাবেন, এটা নিজস্ব সম্পদ। প্রকৃতপক্ষে উপহার যাতে নিজের সম্পদ না হয়, কেউ উপহার দিয়ে ফায়দা না নিতে পারে, পাশাপাশি কেউ উপহার পেলে তা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করার জন্যই তোশাখানা আইনটি করা হয়।’

কেউ উপহার পাওয়ার পর তা তোশাখানায় জমা না দিলে তাকে বাধ্য করার মতো কোনও বিধি তোশাখানা আইনে নেই। তবে কেউ যদি তা নিজের কাছে রেখে দেন তাহলে উপহারটি অবৈধ সম্পদে পরিণত হয় বলে জানিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘তোশাখানা আইনে শাস্তি বা প্রয়োগের বিষয় উল্লেখ না থাকলেও সমস্যা নেই। কেউ যদি তার পাওয়া উপহার জমা না দেন তাহলে সেই সম্পদটা অবৈধ হয়ে যাবে। তখন সেটা অন্য আইনে কাভার করবে। এক্ষেত্রে ভাষাটা হবে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য সম্পদ অর্জন। যা স্পষ্টভাবে সংবিধানের ২০ এর ২ অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে।’  

তোশাখানা আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর জন্য ৫০ হাজার টাকা; স্পিকার, মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার, প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৩০ হাজার টাকা; সংসদ সদস্য, সরকারের সকল কর্মকর্তা ও অন্যদের জন্য পাঁচ হাজার টাকার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এরচেয়ে বেশি মূল্যের উপহার পেলে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করতেই হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মূল্যায়ন কমিটি এই উপহার সংগ্রহ, মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ করবে।

তোশাখানা জাদুঘর

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তোশাখানার দুটি ভাগ রয়েছে। একটি রয়েছে বঙ্গভবনের মানুক হাউজে। স্বাধীনতার পর যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে মানুক হাউজে আর উপহার রাখার মতো জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পৃথক তোশাখানা জাদুঘর তৈরির উদ্যোগ নেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংরক্ষিত উপহারগুলোর মধ্যে প্রদর্শনযোগ্য উপহারগুলো সাধারণ মানুষকে দেখার সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিজয় সরণিতে সামরিক জাদুঘরের পাশে স্থাপন করা হয় তোশাখানা জাদুঘর। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর তোশাখানা জাদুঘরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হলেও জনবল সংকটের কারণে তা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জাদুঘরের পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম পাটওয়ারী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের লোকবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। লোকবল পাওয়া সাপেক্ষে দ্রুত সময়ের মধ্যে জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে।’

তোশাখানা জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য কার কার উপহার সামগ্রী রাখা হয়েছে এমন প্রশ্নে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের দেওয়া বিভিন্ন সময়ের উপহার আমাদের জাদুঘরের প্রদর্শনের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান উপহারগুলোও আমাদের এখানে রয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে উপহার জমা না দেওয়ার অভিযোগে ১৯৯১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা করে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে পাওয়া বিভিন্ন উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেননি। এ মামলায় এরশাদকে তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়। যদিও ২০১৭ সালে খালাস পেয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, উপহার তোশাখানায় জমা না দেওয়ায় সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের তিন বছরের জেল হয়েছিল। এই দৃষ্টান্ত আমাদের দেশেই রয়েছে। কিন্তু সেটা প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নেই। তোশাখানা আইন যাদের জন্য প্রযোজ্য তারাই যে শুধু লঙ্ঘন করছেন তা নয়। এটা মনিটর ও সমন্বয় করার দায়িত্বে যারা আছেন, তারাও সঠিকভাবে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন কিনা সেটা আমাদের জানা নেই। তাদের প্রয়োগের ক্ষেত্রটা শূন্য বলে মনে করছি। যে কারণে ‍সংশ্লিষ্টরা উপহার জমা না দিয়ে অবৈধভাবে নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছেন।

/আরজে/টিএন/আপ-এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ