মানবপাচার ইস্যুতে ভুগছে সরকার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে আরও অবনমনের শঙ্কা

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ০৮:০০, জানুয়ারি ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৭, জানুয়ারি ২৬, ২০২০

মানবপাচার

দেশে মানবপাচার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। এমন ঘটনা পুরোপুরি থামাতে না পারা এবং মানবপাচার সংক্রান্ত মামলাগুলোর জট ছাড়াতে না পারায় আন্তর্জাতিক চাপেও আছে দেশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার বিষয়ক প্রতিবেদনে আরও অবনমনের শঙ্কায় রয়েছে সরকার।

মানবপাচার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশের তিন পাশেই ভারতের সঙ্গে সীমান্ত থাকায় বেশিরভাগ মানবপাচারের গন্তব্য হয়ে থাকে ওই দেশের বিভিন্ন শহর। আর এর শিকার হচ্ছেন মূলত গরিব ও অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত নারীরাই। ভালো কাজের প্রলোভনে পড়ে সীমান্ত অতিক্রমের পরই তারা বুঝতে পারেন পাচারকারীচক্রের খপ্পরে পড়েছেন তারা। সরকারি হিসাবে, দেশের ১৭টি জেলা থেকে প্রতিবছর ভারতে অনেক নারী পাচার হচ্ছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী পাচার হয় যশোর, নড়াইল ও খুলনা থেকে। বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সত্ত্বেও পাচারকারীদের ঠেকাতে পারছে না সরকার।

এছাড়া সাগরপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া নিয়ে যাওয়ার নামে মানবপাচারের ঘটনাও ঘটে থাকে। অন্যদিকে, উন্নত জীবন ও ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের ঘটনাতেও মাঝেমধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে বাংলাদেশ। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা বিভিন্ন দেশের আদালতে দণ্ডিত হয়ে বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হলে কূটনৈতিক চেষ্টায় তাদের ছাড়িয়ে দেশে ফেরার উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো। তবে এমন ঘটনাগুলো পুরোপুরি রুখে দেওয়ার মতো সক্ষমতা পুরোপুরি অর্জনে সক্ষম হয়নি বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এসব তথ্য স্বীকার করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে দুই বছরে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার নারী ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে বাংলাদেশে আসার জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে সরকার ফেরত আনতে পেরেছে মাত্র ১ হাজার ৭৪৪ জনকে। আইনসংক্রান্ত জটিলতায় তাদের সবাইকে এখনও ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে নৌকায় করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গারা মানবপাচারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘মানবপাচারের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন নারীরা। অনৈতিক কাজের জন্য এসব নারীকে বিভিন্ন কৌশলে নিয়ে গিয়ে ভারতে বিক্রি করে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যা আবেদন পেয়েছি তার ৯০ শতাংশের বেশি নারী বিভিন্ন পতিতালয়ে অবস্থান করছিল। উদ্ধার করার পরে তারা বিভিন্ন এনজিও বা অন্য কোনও জায়গায় আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পেরেছি যারা আবেদন করেছিলেন তাদের মধ্যে ২ হাজার ৫০০ জনের মতো নিজেদের ব্যবস্থায় বা অন্য কারও সহায়তায় বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। আর আমাদের হিসাব অনুযায়ী ৫ হাজারের মতো আবেদন এখনও  নিষ্পত্তি হয়নি।’ ওই কর্মকর্তার মতে, মানবপাচার অপরাধটি জটিল, কারণ এর একটি বড় অংশ দেশের বাইরে সংগঠিত হয়। সেখানে দেশের আইন কাজে আসে না।

যুক্তরাষ্ট্রের টিআইপি রিপোর্ট

এদিকে এই সমস্যা নিরসন করতে না পারায় গত তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার (ট্রাফিকিং ইন পার্সন) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়, অপ্রতুল মামলা, যে মামলা হয় সেটির বিচার না হওয়া, বিচার হলেও শাস্তি না হওয়া প্রভৃতি। ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ আইন করা হলেও এর অধীনে মামলার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গত আট বছরেও তৈরি করতে পারেনি সরকার।

এ প্রেক্ষাপটে এ বছর অবস্থানের উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখছে সরকার। কারণ, গত তিন বছর ধরে নজরদারির তালিকায় আছে বাংলাদেশ। এতদিন দ্বিতীয় ধাপে থাকার পর এবছর আরও অবনমন হয়ে তৃতীয় ধাপে নেমে যাওয়ার আশংকা আছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় এবং সঙ্গত কারণে রাজনৈতিক। 

তারা দাবি করেন, ভারতসহ অনেক দেশের মানবপাচার অপরাধের অবস্থা বাংলাদেশের থেকে খারাপ হলেও তারা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে আছে, যেটি হওয়ার কথা নয়।

তবে তারা স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের কারণেই নয়, নিজেদের প্রয়োজনেই মানবপাচার পরিস্থিতির উন্নতির প্রয়োজন। 

সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে মানবপাচারের ঘটনায় ৬৪৪টি মামলা হয়েছে। নিষ্পত্তি হয়েছে চারটি মামলা, ১১ জনের যাবজ্জীবন ও তিনজনের অন্যান্য মেয়াদে শাস্তি হয়েছে। ২০১৮ সালে মোট মামলা হয়েছে ৫৪৭টি, ৩৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে। সাতজনের যাবজ্জীবন এবং একজনের অন্য মেয়াদে শাস্তি হয়েছে। ২০১৮ সালে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ছিল ৩,৮৫৩টি। এক বছর পরে সেটি দাঁড়ায় ৪,৪৪০টিতে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মানবপাচার মামলা নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশে পৃথক কোনও ট্রাইব্যুনাল নেই। এই মামলা করা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে।’ বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে প্রচুর মামলা হওয়ার কারণে মানবপাচার মামলাগুলো পেছনে পড়ে যায়। নিষ্পত্তিতে অনেক সময় লাগে যার নেতিবাচক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্টে পড়ে বলে তিনি জানান। 

বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নগামী হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য ও মানবতা সহায়তা ছাড়া অন্য সব সুবিধার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। এর ফলে হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রশিক্ষণের জন্য যায় সেখানে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে হতে পারে।’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মানবপাচার মামলার একটি জট আছে। এটি কমানোর জন্য ইতোমধ্যে সরকার ময়মনসিংহ বাদে অন্য সাতটি বিভাগীয় শহরে সাতটি মানবাপাচার প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের অনুমতি দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সবার অনুমোদন হয়ে গেছে। আশা করছি আইন মন্ত্রণালয় এ বছরের প্রথম ভাগেই ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু করতে পারবে।’

/এমআর/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ