যড়যন্ত্রকারীরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগেই আক্রমণ করবে: রাশেদ খান মেনন

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:০৭, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১০, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

রাশেদ খান মেনন

গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন,  ধর্মবাদী তো বটেই, ওই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ডান ও তথাকথিত বামও এক হচ্ছে। তারা  স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগেই মরিয়া আক্রমণ করবে। অবশ্য স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন উন্নত দেশ করার লড়াইও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন মেনন।

সংসদে দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রসঙ্গ টেনে মেনন বলেন, রাষ্ট্রপতি সংসদীয় পদ্ধতির রীতি অনুসারে কেবিনেট অনুমোদিত বক্তব্য বলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সাফল্য, কর্মোদ্যোগসমূহ বিস্তারিতভাবে তার বক্তৃতায় বলেছেন। তবে সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যে কথাগুলো তিনি বলছেন তা কেবল গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণই নয়, সরকারের এই কর্মোদ্যোগকে এগিয়ে নিতে দিক-নির্দেশকও বটে।

তিনি বলেন, শিক্ষার হার বেড়েছে। ঝড়ে পড়া কমেছে। প্রাথমিক শিক্ষা চক্র সমাপণের হার বেড়েছে। কিন্তু শিশুরা হারিয়েছে শৈশবের আনন্দ। পিএসসি নামক পাবলিক পরীক্ষার ভয় তাদের প্রথম থেকেই কোচিং নির্ভর করেছে। এটা ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ছিল না। এটা তুলে দেওয়ার কথা উঠলেও, উঠছে না। প্রাথমিক শিক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি হলেও শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি, অংক, কোনোটাই ভালোভাবে জানে না। শিক্ষার গোড়ায় এই গলদ মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, এমনকি উচ্চশিক্ষায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে।

মেনন বলেন, পাঠ্য বইয়ে হিন্দু লেখকদের লেখা তুলে দেওয়া, গল্প-কথা-চিত্রে ধর্মভাবের প্রতিফলনের নতুন সব ব্যবস্থা আমাদের আতঙ্কিত করে। সেই ছোটবেলায় আমাদের মধ্যে পাকিস্তানি ভাব আনতে, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’কে ‘সুবেহ সাদেকে উঠে দিলে দিলে বলি, হররোজ আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ বলে পড়ানো হতো। সেই ভাবটাই নিয়ে আসা হচ্ছে পাঠ্যবইগুলোতে।

রাষ্ট্রপতির সংসদের বাইরে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে রাশেদ খান মেনন বলেন, রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যে কথা বলছেন তা আরও ভয়ঙ্কর। সান্ধ্যকোর্সের নামে বাণিজ্য, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় আপত্তি, ভিসিদের দুর্নীতি, গবেষণা না করা-এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।

তিনি বলেন, আইসিটিতে আমরা প্রচুর অর্থ আয় করতে পারলেও, আইসিটি শিক্ষাকে লেজে-গোবরে করে ফেলেছি। এখানেও গোড়ায় গলদ।

তিনি আরও বলেন, উপজেলায় ডাক্তার থাকে না। মেডিক্যাল শিক্ষার বিস্তৃত ব্যবস্থা হলেও, সেখানকার দুর্নীতির সব দুভার্গ্যজনক খবর বেরুচ্ছে। চীন যেখানে করোনা ভাইরাসের মোকাবিলায় সাতদিনে হাসপাতাল বানিয়ে ফেলছে, সেখানে আমাদের বিমানবন্দর-স্থলবন্দরে রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করতে পারে নাই। যে মনোভাবের কারণে ডেঙ্গু নিয়ে মেয়র-স্বাস্থ্যমন্ত্রী উপেক্ষা-উপহাস করেছিলেন করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে সেটা হলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে?

অর্থনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী সংসদে অর্থনীতির ভালো অবস্থার কথা বললেও, বাইরে স্বীকার করেছেন যে রফতানিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নেতিবাচক। আয়বৈষম্য এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঋণ খেলাপি বাড়বে না বলে অর্থমন্ত্রী যে দাবি করেছিলেন তা মিথ্য প্রমাণ করে গত এক বছরে ২২ হাজার কোটি টাকার ওপর খেলাপি ঋণ বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে যে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন তা ব্যবসায়ী বান্ধব হলেও, ব্যাংক বান্ধব বা অর্থনীতি বান্ধব ছিল না।

সংসদে ৬৮ বিধিতে নোটিশ দিলেও আলোচনায় দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদে কোন নোটিশ গ্রহণ করা হবে, কী আলোচনা করা যাবে তা নির্ধারণের এখতিয়ার স্পিকারের। এমনিতেই ’৭০ বিধির কারণে সংসদ সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের স্বাধীন মতামত দিতে পারেন না। তার ওপর এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা না গেলে, সংসদে কেবল আমরা স্তুতি শুনবো। সংসদ সম্পর্কে জনগণ এমনটি সদস্যরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবো।

মেনন বলেন, বাংলাদেশ ঋণখেলাপিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর শীর্ষে। গত দশ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থ পাচারকারীরা কানাডা, মালয়েশিয়া, ব্যাংককে বেগমপাড়া বানিয়েছে। সংসদে ঋণ খেলাপিদের মতো এই অর্থ পাচারকারী-বেগমপাড়ার মালিকদের নাম প্রকাশ করা হোক। ব্যাংক নিয়ে একটা সমাধানে আসতে ব্যাংক কমিশন গঠন করা হোক। একই পরিবারের ৯ জন ব্যাংক পরিচালক হওয়ার যে বিধান- ব্যাংক মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে বিধান করে যে আইন হয়েছে তা রদ করা হোক। ব্যাংক লুটেরাদের অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।

তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্প আশি ভাগ রফতানি আয়ের উৎস হলেও এক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ছি। ৩২ হাজারের ওপর শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই নারী। অটোমেশনের প্রভাবে চাকরি ছাঁটাই হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। নারী শ্রমিকদের কাজের স্থানে নিরাপত্তা, ৬ মাসের মাতৃত্ব ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহ নির্মাণ শ্রমিকদের আইন করতে হবে।

ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ধরিত্রী কন্যা উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু সুন্দরবনের পাশে রামপালের কয়লা বিদ্যুৎ কারখানা, এলপিজি কারখানাসহ বিপজ্জনক সব কারখানার ভিড়ে তখন সুন্দরবন থাকবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিণামে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কার্বন বোমার খপ্পরে পড়বে।

তিনি বলেন, কিছু মুনাফালোভীর দল পরিবেশ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সব উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। আমরা নেপাল ও ভুটানের সহযোগিতায় বিদ্যুৎ পাওয়ার পথ ছেড়ে কিছু ব্যক্তির মুনাফা লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করছি। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে। তবে নিজের পরিবেশ-প্রতিবেশ-ঐতিহ্য আর মূল্যবোধকে ধ্বংস করে আমরা সে পথে এগুবো কিনা সেটা আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে।

মেনন বলেন, যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর পক্ষে ওয়াজকারী  আজাহারী সম্পর্কে ধর্মমন্ত্রী বলেছেন তিনি জামায়াতের পক্ষ হয়ে সে কাজ করেছেন। আইসিটি আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয় নাই। বরং তাকে নির্বিঘ্নে মালয়েশিয়ায় চলে যেতে দেওয়া হয়েছে। আর শরিয়ত বাউলকে আইসিটি আইনে গ্রেফতার করে জেলখানায় রাখা হয়েছে। আমাদের দেশে শরিয়ত ও মারফতের দ্বন্দ্ব অনেক পুরাতন। এখন সৌদি-পাকিস্তানি ও জামায়াতিদের ওহাবিবাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করতে এ ধরনের দ্বন্দ্বের সম্পর্কে যখন রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবহার করা হয় তখন উদ্বেগের বিষয়।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো সিটি করপোরেশন ভোটের দিন তাদের কোথাও দেখা যায় নাই। এটা সত্য যে ওই নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে খুব কম এসেছে। কিন্তু সেটা কেবল এ (বিএনপির) কারণেই নয়। আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলের সমর্থকরাও ভোট দিতে আসে নাই। ভোট থেকে মানুষের এই দূরত্ব গণতন্ত্রের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। নির্বাচন তো বটেই, রাজনৈতিক দলগুলোকেও অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে।

 

 

/ইএইচএস/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ