বাংলা কেন শক্তিশালী ভাষা?

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:৪৮, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০

বাংলা ভাষা তার নিজস্ব গতি, ছন্দ আর জীবনীতে অম্লান হয়ে উঠেছে। চর্যাপদ থেকে যার জন্ম, সেই ভাষা আজ বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে। কেননা, এই ভাষার আন্দোলনে শহীদ দিবসটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি মাতৃভাষা দিবস। সব ভাষাকে সম্মানিত করার একটি দিন উপহার দিয়েছে একটি ভাষা। সেই বাংলা ভাষার শক্তির জায়গা কোনটা?

ভাষার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক শক্তির কথা উল্লেখ করে চিন্তাবিদরা বলছেন, যে ভাষায় যত বেশি মানুষ কথা বলে, যত বেশি মানুষ শিক্ষিত হয়, সে ভাষা ততই অর্থনৈতিক শক্তির আধার হয়ে ওঠে। বাংলা একমাত্র ভাষা, যে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রাণ দিতে হয়েছে। এই ভাষা একটি দেশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে নিয়ে গেছে। ফলে অন্যান্য ভাষার চেয়ে শক্তি এবং পরিচিতিতে অনন্য বাংলা ভাষা।

ভাষার জগতময়তা

অক্সফোর্ড-হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয় এখন বাংলা চর্চা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র। সিয়েরা লিওন একটি দেশ, যার দ্বিতীয় ভাষা বাংলা। ভিন দেশিরা এখন বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় রবীন্দ্র-জীবনান্দকে বাংলা সাহিত্যের গবেষক হিসেবে। এমনকি ভাষার ব্যবহার ও চলন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা চমকে দেওয়ার মতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এরই মধ্যে। রচনা করছেন নতুন আঙ্গিকের বাংলা ব্যাকরণ। কেন করছেন? আজকের বিশ্বে সে ভাষাই তত বেশি শক্তিশালী, যে রাষ্ট্রের অর্থনীতি যত বেশি চাঙ্গা। তার কারণ কী? কারণ হচ্ছে শক্তিশালী ভাষাভাষীর মানুষেরাই বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই ভাষাকে টিকে থাকতে হচ্ছে এই অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই।

পথটা কেমন ছিল?

রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৫২ সালে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার পুলিশের গুলিতে নিহত হলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। ১৯৫৪ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করা হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে ১৯৫৪ সালে থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সেসময় বাংলা ছিল কেবল বাংলা অঞ্চলের বাংলার মানুষের ভাষা। এ অঞ্চলের অর্থনীতি-রাজনীতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাষা শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করে।

কানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাংলাদেশি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম। ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জন্য প্রাথমিকভাবে ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে একটি আবেদন করেন তারা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সাল থেকে দিনটি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতিবছর দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। দিনটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হয়।

বাংলা ভাষার শক্তি দুটি জায়গায় উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌরভ শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটা হচ্ছে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়। এর মধ্য দিয়ে মানুষ প্রথম জানলো ‘বাংলা’ নামে একটি ভাষা আছে, তার সাহিত্য আছে। আর দ্বিতীয়টি প্রায় ৮৩ বছর পর এসে যেদিন ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেলো। পৃথিবীতে মানুষ আবারও নতুন করে জানলো যে, বাংলা নামের একটি ভাষা আছে, এই ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘এখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীতে সপ্তম অবস্থানে আছে বাংলা ভাষা। এত জনসংখ্যার একটি দেশ, এই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, এজন্য মানুষের মধ্যে ভাষা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিকসহ নানা কারণে। সুতরাং, আগের চেয়ে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করবে।’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড টিপস-এর জরিপ বলছে, ভাষাভাষীর সংখ্যার হিসাবে সপ্তম স্থানে রয়েছে বাংলা ভাষা। বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে ২৬ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে।

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভাষাকে যখন শক্তি হিসেবে ধারণ করা হয়, তখন সাহিত্য-সংগীত তৈরি হয়। কারণ, ভাষাই প্রধান প্রকাশের মাধ্যম, বাংলা ভাষার শক্তিটা এখানেই। আমাদের সৃষ্টিশীল কর্মপ্রবাহ বহু পুরনো। চর্যাপদ থেকে তার তারিখ নির্ণয় করতে পারি। তার আগেও বাংলা ভাষা ছিল, যার প্রমাণ হয়তো আমরা পাই না।’

তিনি বলেন, ‘বাংলার আরেক শক্তির জায়গা আমাদের সংখ্যা। এখন সারাবিশ্বে ব্যবহারকারী সংখ্যার দিক থেকে সপ্তম শক্তিমান ভাষা বাংলা। সাম্প্রতিক সময়ে ভাষার শক্তি যোগান দেয় দেশের অর্থনীতি।’ উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোরিয়ার ভাষা আগে কেউ জানতো না। কিন্তু এখন ঢাকার অলিগলিতে এই ভাষা শেখানোর নোটিশ চোখে পড়ে। যদি অর্থনৈতিকভাবে তারা পরাশক্তি না হতো তাহলে কিন্তু এমনটা হতো না।’

অর্থনীতি ভাষাকে গতিশীল করে উল্লেখ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘অর্থনীতি অন্য ভাষার মানুষকে আমাদের ভাষার প্রতি আকৃষ্ট করে। ব্যবসা-বাণিজ্যে যখন ভাষা ব্যবহার হতে থাকে, তখন সেটা ভিন্ন মাত্রা দাঁড়ায়। বাংলা ভাষার শক্তি কেবল সাংস্কৃতিক, এটা ভেবে বসে থাকার সুযোগ নেই। ভাষার শক্তি রাজনৈতিকও। কারণ, বাংলা ভাষার শক্তি তখন আবিষ্কার করলাম- যখন আত্মদানের মধ্য দিয়ে পাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করলাম। তারপরে আবিষ্কার হলো, এই ভাষাই পারে আমাদের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন কোনও ভাষার রাজনৈতিক শক্তি থাকে এবং তার সঙ্গে অর্থনৈতিক শক্তি যুক্ত হয়, তখন সত্যিকার অর্থে শক্তিটা টের পাওয়া যায়।  ভাষার শক্তির পেছনে কাজ করে শিক্ষার প্রসার। যারা শিক্ষিত নয় তাদের ভাষা মৌখিক পর্যায়ে আটকে থাকে। লিখিত রূপটা তেমন শক্তিশালী হয় না। আমাদের যত মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে তত ভাষার ব্যবহার বাড়ছে।’

প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে অনুসরণ করে যখন আন্তর্জাতিকভাবে  মাতৃভাষা দিবস পালনের বিষয়টি নিশ্চিত হলো, তখন এর শক্তিটা প্রকাশ হলো বিশ্বব্যাপী। তিনি বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস।’ সেই ভাষার শক্তিটা কোথায় বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা এমন একটা ভাষা যার অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সংগ্রাম হয়েছে, মানুষ প্রাণ দিয়েছে। সেই বাংলাভাষী লোক এখন বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৩০ কোটি। এই বিপুল জনসংখ্যার মানুষ যখন একটি ভাষায় কথা বলে, তার শক্তি প্রতীয়মান হয়, দৃশ্যমান হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো, যেখানে ভাষাভিত্তিক জাতিয়তাবাদী অনুপ্রেরণা ছিল। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ প্রত্যাখ্যানের বিষয় ছিল। এসবই বাংলাকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করে তুলেছে। আর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ও পরিচিতি, তার আলাদা মূল্যায়ন অবশ্যই যুক্ত করতে হবে।’

 

/এমআর/এপিএইচ/

লাইভ

টপ