স্বাধীনতার দিনেও স্তব্ধ চারপাশ

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৭:৩৮, মার্চ ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫০, মার্চ ২৭, ২০২০




 আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিন আজ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙলা মায়ের দামাল ছেলেরা।  মরণপণ লড়াই এবং রক্তসমুদ্র পাড়ি দিয়ে বীর বাঙালি ছিনিয়ে আনে জাতীয় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন– স্বাধীনতা।

তবে বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার ৪৯ বছর পর আজকের দিনটি খুব চুপচাপ পালিত হচ্ছে। উৎসবের এই দিনে রাজধানীসহ সারা দেশই স্তব্ধ। দিবসটির মূল অনুষ্ঠান রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় স্তব্ধতা একটু বেশিই মনে হচ্ছে। ভাইরাসের কারণে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান সব বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ঘরে অবস্থানের নির্দেশনায় অন্যরকম এক স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছেন দেশবাসী।

প্রতিবারের মতো এবার স্বাধীনতা দিবসে নেই লাল সবুজের ছোঁয়া, নেই আলোকসজ্জা। জনশূন্য পথঘাট এবং ফাঁকা রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আলাদা সাজসজ্জা থাকলেও এবার তার কিছুই নেই। জরুরি সেবা ছাড়া সব বন্ধ। রাজধানীর প্রতিটি এলাকার দোকানপাট, রেস্তোরাঁ এমনকি ভ্রাম্যমাণ দোকানও বন্ধ। প্রধান সড়কে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যারিকেড।  পাশাপাশি চলছে সেনা সদস্যদের টহল। তারা মাইকে ঘরে থাকার জন্য জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছেন।

 রাজধানীর কল্যাণপুর, মিরপুর রোড, মহাখালী, নিকেতন, তেজগাঁও, কাওরানবাজার, ফার্মগেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে স্বাধীনতা দিবসের এমন ভিন্ন চিত্র।

এদিকে বুধবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমরা এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জনসমাগম হয় এমন ধরনের সব অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ, যে যুদ্ধে মানুষের দায়িত্ব ঘরে থাকা। তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা যে যেখানে আছেন, সেখানেই অবস্থান করুন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সকলে যার যার ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন। আমরা সবার প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হবো।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এবারের স্বাধীনতা দিবস এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত।

এবার মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দল সব ধরনের কর্মসূচিও বাতিল করেছে।

এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে দেশে সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বুধবার রাত থেকে সারা দেশে বাস চলাচল বন্ধ হয়। লঞ্চ, রেল ও বিমান চলাচল আগে থেকেই বন্ধ হয়। ফেরিতে করে যান ও সাধারণ যাত্রী পারাপার চলছে সীমিত পরিসরে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব জেলায় রাস্তায় লোক চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে ব্যস্ত রাজপথ এখন জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

 করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে মনিটরিং ব্যবস্থা আগের চেয়ে আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দিয়েছেন। জনগণের পাশে করোনাভাইরাস রোধে আমরা সবাই আছি।

এদিকে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক পূর্ব বিভাগ রামপুরা জোনের ডেমরা স্টাফ-কোয়ার্টার চৌরাস্তা, রামপুরা বিটিভি ভবন, ডেমরা জোনের গোলাপবাগ, মানিকনগর, শনির আখড়া, ওয়ারী জোনের রাজধানী ক্রসিং, দয়াগঞ্জ চৌরাস্তা, পোস্তগোলা ব্রিজের প্রবেশপথ, সবুজবাগ জোনের খিলগাঁও এলাকায় জিক-জ্যাক চেকপোস্ট পরিচালনা করে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে।

এছাড়াও ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকাসহ অন্যান্য এলাকায় পণ্যবাহী যানবাহনসহ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত যানবাহন, ড্রাইভার, হেলপারদের বাধ্যতামূলকভাবে জীবাণুনাশক পদার্থ দ্বারা পরিষ্কার করে গন্তব্য যেতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিষয়ে ব্যানার, ফেস্টুন প্রদর্শন ও জনসাধারণের মাঝে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।

ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সাহেদ আল মাসুদ বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনস্বার্থের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পণ্যবাহী যানবাহনসহ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত যানবাহনে বাধ্যতামূলকভাবে জীবাণুনাশক পদার্থ দ্বারা পরিষ্কার করা হচ্ছে। আর আমরা আপনাদের জন্য ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় আছি, আপনারা ঘরে থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করুন।

স্বাধীনতা দিবসের এমন রূপ এর আগে কখনই দেখেননি শ্যামলীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী জাকির। তিনি বলেন, জাতীয় দিবস হলো আমাদের দেশের উৎসবের দিন। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় চারপাশ। শিশু মেলায় সারা দিন ভিড় থাকে। মানুষের জন্য জ্যাম লেগে যায় রাস্তায়। কিন্তু আজকের এই দৃশ্য আগে কখনোই জাতীয় কোনও দিবসে দেখিনি।

উল্লেখ্য, সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২০০ বছরের ব্রিটিশ-বেনিয়া শাসনের অবসানের পর ২৪ বছর ধরে বাঙালি জাতি ভোগ করে বিজাতীয় ভাষাভাষী গোষ্ঠীর শাসন-শোষণ ও আগ্রাসন। ’৪৭-এর দেশভাগের পর উর্দু শাসকদের নানা কর্মকাণ্ডের ফুঁসে উঠতে থাকে বাঙালি জাতি। মাতৃভাষার দাবিতে ’৪৮ সাল থেকে শুরু করে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তদান, সংগ্রাম-আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে রায়, ’৫৬-তে এসে সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতি আদায়, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফার মধ্য দিয়ে বাঙালির মুক্তিসনদ ঘোষণা, ’৬৯-এর ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিদায় এবং ’৭০-এ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ধারাবাহিকতায়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আসে স্বপ্নের স্বাধীনতা।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/টিটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ