রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে নতুন আইন হচ্ছে: শিথিল হচ্ছে নারী নেতৃত্বের শর্ত

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ০১:৫৫, জুন ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১৮, জুন ০২, ২০২০

নির্বাচন কমিশন

রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি খসড়াও তৈরি করে কমিশন সভায় তোলা হয়েছে। এতে ২০২০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব বাধ্যবাধকতার শর্ত শিথিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ এর অধীনে দলের নিবন্ধনের বিষয়টি রয়েছে। ওয়ান ইলেভেনের সময়কার কমিশন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে আরপিও সংশোধন করে ওই বিধানটি যুক্ত করেছিলেন। নতুন পৃথক আইন হওয়ার প্রেক্ষাপটে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ওই অংশ বাদ দিতে এটারও সংশোধনের প্রয়োজন হবে। জানা গেছে, কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তা করছে। এক্ষেত্রে তারা ১৯৭২ সালের আদেশের পরিবর্তে গণপ্রতিনিধিত্ব আইন নামে বাংলায় সম্পূর্ণ নতুন আইন প্রণয়ন করবে। 

সোমবার (১ জুন) কমিশনের সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সভায় নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা দলের নিবন্ধন সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন উপস্থাপন করেন বলে জানা গেছে। পরে বিষয়টি নিয়ে কমিশনাররা মতামত দিলেও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর  বলেন, কমিশনের সভায় বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত হলেও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সংক্রান্ত আলাদা আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে যে বিধান বা শর্তগুলো ছিল সেগুলো নতুন আইনে চলে আসবে। আলোচনা করে নতুন আইনে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শর্তাবলী সংযোজন বা বিয়োজন হবে।

আগামীতে পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। সরাসরি বা চিঠি দিয়ে কিংবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে ইসি সচিবালয়ে কমিশনের ৬৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার এজেন্ডায় গণপ্রতিনিধিত্ব আইন, ২০২০ এর খসড়া বিল অনুমোদন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত আইন বাংলা প্রণয়ন, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের স্থগিত নির্বাচনের ওপর আলোচনা ও সিদ্ধান্ত প্রহণ ও জাতীয় সংসদের সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ আইন আইন ২০২০ এজেন্ডায় ছিল। সভায় এজেন্ডাভুক্ত এসব বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়া বৈঠক শেষ হয়। ওই বৈঠকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে যেসব নির্বাচন আটকে আছে সেগুলোর তথ্য উপস্থাপন করতে ইসি সচিবালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা নিজেই নতুন আইনের খসড়া তৈরি করেছেন। অতি গোপনীয়তার সঙ্গে ওই খসড়া শুধু নির্বাচন কমিশনারদের দিয়েছেন । প্রচলন অনুযায়ী বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের আলোচনার জন্য কার্যপত্র দেয়া হলেও সোমবারের বৈঠকে তা দেওয়া হয়নি।

তবে বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নতুন আইন প্রণয়নের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় সংসদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীকে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। আরপিও শুধুমাত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত আইন। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করতে গিয়ে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। বৈঠকে খসড়া আইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। পরবর্তী বৈঠকে এটি নিয়ে আবারও আলোচনা হবে।

ওই বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধন শর্ত অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করে কিনা –তা খতিয়ে দেখা হয় না বলে মন্তব্য করেন। তিনি রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনে দুইবছর পর পর তা রিনিউ (নবায়ন) করার বিধান যুক্তের প্রস্তাব করেন। এছাড়া কমিশনার নিয়োগে আইন করার প্রস্তাবও দেন ওই কমিশনার।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর খসড়ায় নির্বাচনসংক্রান্ত কিছু শব্দ বাংলা ভাষায় রূপান্তর না করে ইংরেজিতে মূল শব্দ হিসেবে রেখে দেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বলা হয়, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে নতুন আইন হলে আরপিওর কিছু জায়গায় সংশোধনী আনার প্রয়োজন হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কমিটিতে ২৬ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন। বিএনপির সব পর্যায়ের কমিটিতে ১৫ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন। সেই তুলনায় এগিয়ে থাকা জাতীয় পার্টি-(জাপা) সব স্তরের কমিটিতে ২০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রেখেছে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটিতে নারী নেতৃত্বের হার আরও অনেক কম হতে পারে। তবে ইসি সেটি এখনও যাচাই করে দেখেনি।

২০০৮ সালে নিবন্ধনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ হার ছিল শতকরা ১০ ভাগ। আইনে শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত ১২ বছরে এই অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। গত ১২ বছরে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী নেতৃত্ব বাড়ার হার ১০ ভাগেরও নিচে। ফলে, ইসির বেঁধে দেওয়া বাকি সময়ের মধ্যে আরও ১২ থেকে ১৫ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা অসম্ভব ব্যাপার। এই বাস্তবতায় আইনের ধারাটি বহাল থাকলে শর্ত ভঙ্গের জন্য বেশিরভাগ দলের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে নতুন বা শর্ত শিথিল করতে হবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও দরটির সর্বশেষ সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে কমিটির সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার শর্ত শিথিল করেছে।

/টিএন/

লাইভ

টপ