ঈদুল আজহার আর বাকি তিন দিন। বরাবরের মতো নগরবাসীর এখন ঈদ উদযাপনে দল বেঁধে বাড়ি ফেরার পালা। রাস্তায় থাকার কথা যাত্রীবাহী যানবাহনের চাপ। বাস কাউন্টারগুলো পর্যাপ্ত গাড়ি দিতে হিমশিম খাওয়ার কথা। রেলের বগিগুলো পরিপূর্ণ হয়ে ছাদে উঠে বাড়ি ফেরার কথা হাজারো মানুষের। কিন্তু এসবের কোনোটাই নেই এবারের ঈদযাত্রায়। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড কোথাও নেই যাত্রীর চাপ। অলস বসে আছে বাস কাউন্টারগুলোর মাস্টাররা। রাস্তায় কমেছে বাসের সংখ্যাও। মূলত করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণেই ঈদযাত্রায় এই অচেনা পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে বলে ধারণা বাস কাউন্টার মাস্টারদের।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড এবং কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, বাসস্ট্যান্ডগুলোতে তেমন কোনও যাত্রী নেই। অল্প কিছু যাত্রীর আনাগোনা। রেলস্টেশনেও একই অবস্থা। নেই টিকিট কাউন্টারের সামনে ভিড়, যেখানে অন্যান্য সময়ে ভোর রাত থেকে লাইন লেগে থাকতো টিকিটের। বাসস্ট্যান্ডগুলোতে অন্যান্য সময় যেখানে যাত্রীর ব্যাগ ধরে হেলপাররা টানাটানি করতো, এবার তাদের ডাকাডাকি করতেও দেখা যায়নি। বাস কাউন্টার মাস্টাররা পার করছেন অলস সময়। কমেছে গাড়ির সংখ্যাও।
গাবতলী বাস টার্মিনালে বেশ কয়েকটি পরিবহন কাউন্টারে কথা বলে জানা গেছে, আগের ভাড়া থেকে ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে বাসে মোট ২০ জন যাত্রী নিয়ে চলতে পারবে বলে জানানো হয়েছে। সেখানে ওই ভাড়া থেকে ভাড়া কমিয়েও ২০ জন যাত্রী পূর্ণ করে বাসগুলো ছাড়তে পারছে না। বেশিরভাগ বাসেই তিন থেকে ছয়টি সিট খালি থেকেই যাচ্ছে। কোনও কোনও সময় তো নির্ধারিত বাস ছাড়ছেই না যাত্রীর অভাবে। মাস্টাররা মনে করছেন, বর্তমান সময়ে মানুষের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই, তাই তারা বাড়ির পথ ধরছে না।
বরিশালগামী সাকুরা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার ইব্রাহীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টিকিট তেমন বিক্রি হচ্ছে না। আমাদের বাসের সংখ্যা অনেক কমানো হয়েছে। ২০ জন যাত্রী নিয়ে বাস ছাড়ার কথা থাকলেও আমরা ১৫ থেকে ১৬ জনের বেশি যাত্রী পাচ্ছি না। আসলে ভাড়াটাও তো অনেক, তাই হয়তো অনেকে বাড়ি যেতে আগ্রহ প্রকাশ করছে না।’
মুজিবনগরগামী রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টার মাস্টার লিটন বলেন, ‘আগে আমরা দিনে ৪৪টি গাড়ি ছাড়তাম। এখন ছাড়ি মাত্র ১৮টি। এরপরেও নির্দিষ্ট সময়ের গাড়িতে চার-পাঁচটি করে সিট খালি থাকে। ব্যবসা একবারে খারাপ। ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়ানো হলেও যাত্রীর কাছে এটা অনেক বেশি মনে হচ্ছে।’
তবে গাবতলীতে সোহাগ পরিবহন এবং হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বিক্রি ঠিকঠাকই আছে। বাসের সংখ্যা কম থাকলেও যাত্রী পরিপূর্ণ হচ্ছে।
মহাখালী বাস টার্মিনালেও দেখা গেছে একই চিত্র। তবে অবস্থা আরও করুণ। সেখানে অবস্থানরত বাস কাউন্টার মাস্টারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৬০ শতাংশ যে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে, তার থেকেও কম ভাড়া নিয়ে যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় পাঁচ জন যাত্রী নিয়ে কাউন্টার থেকে বাস ছাড়ছে। আবার কখনও যাত্রীর অভাবে ট্রিপ ক্যানসেল করে দেওয়া হচ্ছে।
মহাখালী বাস টার্মিনালে জামালপুরগামী রাজিব এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার মোহাম্মদ ইউনুস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাড়া বাড়ানোর পর ৫৮০ টাকা হয়। সেই ভাড়ার বদলে ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা ভাড়া নিচ্ছি। তারপরও যাত্রীর সংকট। কখনও বাসের ট্রিপ ক্যানসেল করতে হচ্ছে। আগে যেখানে আমাদের দিনে ৩৫-৪০টি বাস চলতো, সেখানে এখন বাস চলে মাত্র ২০টি।’
নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী বাসের কাউন্টার মাস্টার তুহিন বলেন, ‘এক হাজার টাকা ভাড়ার বদলে ৭৫০ টাকা ভাড়া নিচ্ছি। তবুও বাস ফুল হচ্ছে না। দিনে যেখানে ৩৫টি বাস চলতো আমাদের, সেখানে এখন চলে মাত্র ১৭টি। একে তে করোনা, তার ওপরে বন্যা। মানুষের আয় রোজগার নেই, তারা কী করেই বা বাড়ি যাবে। হয়তো এজন্যই লোকসংখ্যা কম।’
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে মহাখালীর এনা বাসের কাউন্টারে। ময়মনসিংহগামী এই পরিবহনের সব ট্রিপ পরিপূর্ণ করেই বাস টার্মিনাল ছাড়ছে। রয়েছে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন।
একইরকম যাত্রীহীন চিত্র দেখা গেছে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। বাস কাউন্টারে গেলেই পাওয়া যাচ্ছে টিকিট।
এদিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে রয়েছে সুনসান নীরবতা। নেই টিকিট কাউন্টারের সামনে ভিড়। প্ল্যাটফর্মে নেই যাত্রীর পদচারণা। করোনাকালীন সময়ে যে ট্রেনগুলো চলতো, এখনও সেই ট্রেনগুলো সেভাবেই চলছে। ঈদ উপলক্ষে বিশেষ কোনও আয়োজন নেই রেল বিভাগের। ট্রেনের ট্রিকিট স্বাভাবিক নিয়মেই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম, শাহেদ শফিক ও হাসনাত নাঈম।








