ক্রীড়াঙ্গনে করোনার হানা

Send
তানজীম আহমেদ ও রবিউল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৯:০৯, আগস্ট ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৫, আগস্ট ০৯, ২০২০

করোনাভাইরাসকরোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত পুরো বিশ্বই। বাংলাদেশও এই বাইরে নয়। তার ওপর এই ভাইরাসের আক্রমণে পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে ক্রীড়াঙ্গন। এমনিতে করোনার কারণে সব ধরনের খেলাও বন্ধ আছে গত মার্চ থেকে। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের অনেকেরই এখন করোনার থাবায় নাজুক অবস্থা। ফলে নতুন করে খেলা কিংবা অনুশীলন শুরু করতে গিয়েও নানান রকম বিপত্তি দেখা দিচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে জাতীয় ফুটবল দল।

বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বকে সামনে রেখে জাতীয় ফুটবল দলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে গাজীপুরের সারা রিসোর্টে। করোনায় স্থগিত হয়ে যাওয়া ম্যাচগুলো আগামী অক্টোবর ও নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে। ওই হিসেবে ম্যাচ রয়েছে চারটি। যার মধ্যে তিনটি সিলেট, অন্যটি কাতারের মাঠে হবে। এ উপলক্ষে পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন আর শুরু করা গেলো কই? এর আগেই বড় দুঃসংবাদটি যেন অপেক্ষা করে ছিল। ৩০ জন ফুটবলারের মধ্যে ১৮ জনই ‘পজিটিভ’ হয়েছেন করোনা পরীক্ষায়! এদের কারও মধ্যে অবশ্য কোনও লক্ষণ কিংবা উপসর্গ নেই।

এ নিয়ে ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে)। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা পরীক্ষা করিয়ে বিশেষ করে প্রথম দিন নেগেটিভ জেনেই ক্যাম্পে গিয়েছিলেন খেলোয়াড়রা। অথচ দুই দিন পর সেই খেলোয়াড়দেরই রিপোর্ট চলে এসেছে পজিটিভ! যদিও বাফুফের মেডিকেল কমিটি একে ‘প্রযুক্তিগত সমস্যা’ বলেই দায় এড়িয়েছে।

করোনার হানায় ফুটবলের প্রস্তুতি ঝুলে আছে।  কাল দুটি প্রতিষ্ঠানে আবারও ফুটবলারদের করোনা টেস্ট করা হবে। সেই ফলের ওপরই নির্ভর করে আছে বাফুফে। যদিও বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের মতো কাজ করে যাচ্ছি। নতুন করে দুটি জায়গায় পরীক্ষা হবে। আশা করছি সেই ফলের ওপর ভিত্তি করে নতুন করে ক্যাম্প শুরু করা যাবে।’

মূলত খেলোয়াড়দের পজিটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়েই বিশাল বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক খেলোয়াড় আছেন, যারা বাফুফের আগে করোনা পরীক্ষা করিয়েছেন। এই যেমন ডিফেন্ডার ইয়াসিন আরাফাত। ৩ আগস্ট রাজধানীর একটি বড় হাসপাতালে পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল পেয়েছিলেন। আবার ৫ আগস্ট বাফুফের নির্দিষ্ট হাসপাতালের করা পরীক্ষায় হয়েছেন পজিটিভ!

তাই আরাফাত এখন সোমবারের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছেন, ‘বুঝতে পারছি না। একেক জায়গায় একেক রিপোর্ট আসছে। আমাদের কারও কোনও উপসর্গ নেই, কোনও লক্ষণও নেই। এখন দেখি আগামীকাল কী হয়। আসলে এই অবস্থায় এভাবে নিজেদের মনোবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার আগে আরেক ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষ দুটি বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করিয়েছেন। কিন্তু একেক জায়গার ফল এসেছে ভিন্ন ভিন্ন। এতে করে বিশ্বনাথ ক্যাম্পে যোগ না দিয়ে নিজের বাসায় আইসোলেশনে আছেন, ‘আমি সময় নিচ্ছি। বাফুফেকে জানিয়েছি, দেখা যাক কী হয়। কয়েকদিন পর আবারও পরীক্ষা করাবো।’

জাতীয় দলের ইংলিশ কোচ জেমি ডেও এত বড় সংখ্যক খেলোয়াড়দের পজিটিভ ফল দেখে বিস্মিত, ‘দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। যে কারণে হয়তো এমন অবস্থা হতে পারে। এখন দেখা যাক আগামীকালের পরীক্ষাতে কী আসে।’

করোনা পজিটিভ আসাতে এখন অনুশীলন শুরু করাও কঠিন হয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে একজন স্থানীয় কোচও আক্রান্ত হয়েছেন। করোনাতে অনেক সংগঠকও আক্রান্ত হয়েছেন। গত মার্চ থেকে বাফুফে ও অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন ফেডারেশনের কর্মকর্তারা এই ভাইরাসের সঙ্গে ‘যুদ্ধ’ করছেন, কেউবা সুস্থ হয়েছেন।

ফুটবলের মতো ক্রিকেটও মহামারি এই ভাইরাসটির কবল থেকে রক্ষা পায়নি। জাতীয় দল ও জাতীয় দলের বাইরের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে তারা সেটি জয় করলেও মরণব্যাধি ভাইরাসটি নিয়ে তাদের শঙ্কা-ভয় এখনও কাটেনি।

করোনা আক্রান্ত হয়ে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করেছিলেন মাশরাফিএখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দুই ক্রিকেটার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা ছাড়াও বাঁহাতি স্পিনার নাজমুল ইসলাম অপু করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া জাতীয় দলের বাইরে থাকা বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম তামিম ইকবালের ভাই নাফিস ইকবাল ও মোশাররফ হোসেন। এছাড়া নাফিস ও মাশরাফির পুরো পরিবারই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

যে কারণে দেশের ক্রিকেটও বন্ধ হয়ে আছে সেই মার্চ থেকে। ঘরোয়া, আন্তর্জাতিক সব ধরনের ক্রিকেটই এখন বন্ধ। পাকিস্তানসহ আয়ারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে কয়েকটি সিরিজ এ কারণেই স্থগিত করতে হয়েছে। যদিও জুলাইয়ের শ্রীলঙ্কা সিরিজ আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শুরু হওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এ ব্যাপারে খুব শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। আর এই শ্রীলঙ্কা সিরিজ মাথায় রেখেই ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত অনুশীলনের সুযোগ করে দিয়েছে বিসিবি। তার পরেও ক্রিকেটারদের মধ্যে করোনা নিয়ে শঙ্কা এখনও কাটেনি। ফুটবলারদের এভাবে আক্রান্ত হতে দেখে ক্রিকেটাররাও এখন আতঙ্কিত। যদিও বিসিবি এখনই ক্রিকেটারদের করোনা পরীক্ষা করাবে না। আনুষ্ঠানিক অনুশীলন শুরুর আগেই ক্রিকেটারদের পরীক্ষা করাতে চায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

তবে বিসিবি খুব সতর্কতার সঙ্গেই অনুশীলনের আয়োজন করেছে। মুশফিক-ইমরুলরা এই মুহূর্তে ব্যক্তিগত অনুশীলন করতে পারলেও আপাতত দলীয় অনুশীলনের সুযোগ পাচ্ছেন না। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সিরিজ চূড়ান্ত হয়ে গেলে দলীয় অনুশীলনের প্রয়োজন পড়বেই। সেক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে বিসিবিকে। অন্য দলগুলোর মতো ক্রিকেটারদের করোনা টেস্টে করিয়েই শুরু করতে হবে ক্যাম্প। বিসিবির ভাবনাতেও আছে এমন পরিকল্পনা।

ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান আকরাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমরা এখনও দলীয় অনুশীলনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে এমন কিছু করলে অবশ্যই সবার করোনা টেস্ট করার প্রয়োজন পড়বে। শুধু তা-ই নয়, শ্রীলঙ্কা সিরিজে যাওয়ার আগে এমনিতেই এ টেস্ট দরকার পড়বে।’

তবে সিরিজ শুরুর আগে বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপই নিতে হচ্ছে বিসিবিকে। কারণ, করোনা সংকট কাটিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, পাকিস্তানের মতো বেশ কয়েকটি দল মাঠে ফিরলেও তা সহজ ছিল না। আইসিসির দেওয়া স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ক্রিকেটারদের খেলতে হয়েছে। এই সময়টাতে কেউ আক্রান্ত হলে সবারই আক্রান্ত হওয়ার চান্স থাকে, ফলে প্রত্যেক ক্রিকেটারকে থাকতে হয়েছে জীবাণু সুরক্ষিত পরিবেশে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও দলীয় অনুশীলন কিংবা শ্রীলঙ্কা সিরিজে খেলতে হলেও বাড়তি সতর্কতা মেনেই খেলতে হবে।

এছাড়া অন্য খেলাগুলো, যেমন- হকি, আর্চারি দলও ক্যাম্প শুরু করতে চাইছে। সেক্ষেত্রে ফেডারেশনগুলো করোনা পরীক্ষা করেই ক্যাম্প শুরু করার পক্ষপাতী। কারণ, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকেই সবার মনোযোগ সবচেয়ে বেশি।

/এফআইআর/এফএএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ