‘অভিন্ন আইনে’ হবে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন

Send
এমরান হোসাইন শেখ
প্রকাশিত : ১৪:২১, আগস্ট ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৮, আগস্ট ১০, ২০২০

নির্বাচন কমিশনস্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায় একক আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিদ্যমান ব্যবস্থায় পৃথক পাঁচটি বিধিমালার অধীনে পরিচালিত হয় এই নির্বাচনগুলো। এগুলো অভিন্ন স্বতন্ত্র আইনের অধীনে পরিচালনার লক্ষ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচন আইন, ২০২০’  শিরোনামের এই আইনের খসড়া সোমবার (১০ আগস্ট) কমিশন সভায় অনুমোদন পেতে পারে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, খসড়া আইনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নাম ও পদবি সবই বদলের প্রস্তাবও করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘মহানগর সভা’। পৌরসভার নাম ‘নগরসভা’ ও ইউনিয়ন পরিষদের নাম ‘পল্লি পরিষদ’ রাখা হয়েছে। তবে জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নাম অপরিবর্তিত থাকছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের পদবিও পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদবি বদলে ‘আধিকারিক’ ও পৌরসভার মেয়রদের পদবি ‘পুরাধ্যক্ষ’ রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ইসির প্রস্তাবিত নাম পদবি অনুযায়ী আইনটি পাস হলে তার সামঞ্জস্য বিধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইনেও সংশোধনী আনার প্রয়োজন পড়বে। বর্তমানে দেশে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো হলো ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন।

আইনটি প্রণয়নের যৌক্তিকতা তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনের খসড়ায় বলা হয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। যার কারণে স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন সমীচীন ও প্রয়োজন। এতে আরও বলা হয়,  স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯, উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮, জেলা পরিষদ আইন, ২০০০, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ ও স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এ নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন অধ্যায় ও ধারা সংযুক্ত রয়েছে। ওইসব আইন থেকে নির্বাচন সংক্রান্ত বিধানাবলি আলাদা করতে স্বতন্ত্র আইন করা হচ্ছে।

জানা গেছে, খসড়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সব নির্বাচনে একই বিধান যুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার লক্ষ্যে প্রণীত এই খসড়া আইনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কোন স্তরে প্রথমবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে, মেয়াদ উত্তীর্ণের ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে দ্বৈবদুর্বিপাকজনিক কারণে নির্বাচন কমিশন তার সুবিধাজনক সময়ে তারিখ নির্ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে কমিশনকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার প্রয়োজন পড়বে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দ্বৈব-দুর্বিপাকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানাতে হয়। যার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান সময়মতো করতে না পারার বিষয়টি কমিশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সম্প্রতি চিঠি দিয়ে জানাতে হয়েছে।

অভিন্ন নির্বাচন আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে একেক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে একেক ধরনের বিধান আছে। আমরা স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন পরিচালনায় একই ছাতার মধ্যে আনতে যাচ্ছি। এতে বিদ্যমান আইন ও বিধির সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে।’

প্রতিষ্ঠানের নাম ও পদবি পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক ইংরেজি নামের বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে। এ কারণে নামে পরিবর্তন আসছে। এছাড়া আইনটি সংসদে পাস হবে। সংসদই এসব নাম ও পদবি ঠিক করবে।’

আইনের খসড়া তৈরির সঙ্গে যুক্ত ইসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনের একান্ত আগ্রহে এ খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এটি পরিবর্তন ও পরিমার্জনের জন্য একজন পরমর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। সোমবার খসড়া আইনটি কমিশন সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। কমিশন সভা থেকে যে নির্দেশনা আসবে সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, এ আইন পাস হলে স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের আইনে সংশোধনী আনার প্রয়োজন হবে। ওই সংশোধনীগুলো করবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, খসড়া আইনে সব স্তর যথা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অনেকটা অভিন্ন যোগ্যতা রাখা হয়েছে। পাঁচটি পরিষদের যেকোনও পদে নির্বাচনের যোগ্যতা হিসেবে বাংলাদেশের নাগরিক, বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ভোটার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য বিদ্যমান আইনেও একই যোগ্যতা রয়েছে। এদিকে স্থানীয় সরকার পরিষদের পদে নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়ে যে গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে, নির্বাচন আইনে তার সত্যতা নেই। এখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও বিষয়েই উল্লেখ নেই।

তবে নির্বাচনি অপরাধের কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যমান উপজেলা আইনে বেআইনি কাজের জন্য সর্বনিম্ন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের এবং পৌরসভা আইনে সর্বনিম্ন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ সাত বছর সাজার বিধান রয়েছে। কিন্তু খসড়া আইনের ৫৪ ধারায় এ অপরাধে সর্বনিম্ন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। নির্বাচনে ঘুষ গ্রহণের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডের বিধান খসড়া আইনে বহাল রাখা হয়েছে। জাল ভোট দেওয়ার শাস্তিও আগের মতো দুই বছর থাকছে নতুন আইনে। ভোটগ্রহণ শুরুর আগে বা পরে সভা বা মিছিল করার অপরাধে খসড়া আইনের ৫৭ ধারায় সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য ধারায় বিদ্যমান আইনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজার প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে- আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলতে- পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও অন্য কোনও সরকারি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বুঝানো হয়েছে।

এর পাশাপাশি আইনে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, দায়িত্বে অবহেলার শাস্তি, ভোট প্রদান প্রক্রিয়াসহ অন্যান্য বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনও উদ্যোগের বিষয়ে আমরা অবহিতও নই। সব আইন তো সংসদ পাস করে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আইনগুলোর প্রসিড করা হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে। নির্বাচন কমিশন তাদের রিলেটেড কোনও বিষয় থাকলে হয়তো তা করতে পারে।’

মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকার পরিষদের আইনগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কিছু আইনে অসামঞ্জস্য রয়েছে। যেগুলো আমরা সংশোধনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথাও বলেছি। তবে আইনগুলো আমরা সমন্বিত করছি না।’

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ